চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ: প্রস্থানে নয়, উপস্থিতিতে
সাইফুজ্জামান
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ১:৫১ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬
আজীবন উদাসীন, বাউণ্ডুলে অথচ নিজের কাজের প্রতি অটল আস্থাশীল এক বিরল প্রতিভার নাম তরুণ ঘোষ। প্রথাগত জীবনের ছক ভেঙে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সৃজনশীলতার এক অনন্য উচ্চতায়। গত ৮ এপ্রিল ৭৩ বছর বয়সে এই বরেণ্য শিল্পীর জীবনাবসান ঘটলেও তাঁর কাজ ও দর্শন তাঁকে সমকালীন শিল্পকলার ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
জীবনের পরিলেখ
তরুণ ঘোষ ১৯৫৩ সালের ২০ আগস্ট রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রকৃতিমগ্ন এবং প্রচলিত নিয়মের বাইরে এক প্রগতিশীল চেতনার মানুষ। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি ভারতের বরোদার এম.এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রিয় এই ছাত্র পরবর্তীকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে বিশেষ সম্মান অর্জন করেন।
শিল্পশৈলী ও দর্শন
তরুণ ঘোষের চিত্রকর্মের প্রধান উপজীব্য ছিল লোক-ঐতিহ্য, মিথ (Myth), ইতিহাস এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব। বিশেষ করে তাঁর ‘বেহুলা’ এবং ‘১৯৭১’ সিরিজ চিত্রকর্ম শিল্পবোদ্ধাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।
-
মানুষের স্বরূপ অন্বেষণ: মানুষের মুখের বিচিত্র অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। স্বপ্নের মানুষ বা হারিয়ে যাওয়া মুখশ্রী বারবার তাঁর ক্যানভাসে ধরা দিয়েছে।
-
সুব্রহ্মণ্যনের প্রভাব: বরোদায় থাকাকালীন প্রখ্যাত শিল্পী কেজি সুব্রহ্মণ্যনের সংস্পর্শে এসে তিনি দেশজ শিল্প ও সংস্কৃতির রহস্যময় জগতে প্রবেশ করেন, যা তাঁর শিল্পশৈলীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে।
শিল্প নির্দেশনা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা
কেবল ক্যানভাসেই নয়, রূপালি পর্দাতেও তরুণ ঘোষ রেখে গেছেন তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর। তারেক মাসুদ পরিচালিত বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’-র শিল্প নির্দেশক হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ‘নরসুন্দর’, ‘চন্দ্রাবতী কথা’ এবং ‘সখা বঙ্গমালা’ চলচ্চিত্রেও তিনি শিল্প নির্দেশনার কাজ করেছেন। একটি ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে তরুণ ঘোষের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে—১৯৮৯ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার বিখ্যাত ‘বাঘ’ প্রতীকটি তাঁরই সৃজনশীল মস্তিস্কের ফসল।
মানুষ তরুণ ঘোষ
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন আড্ডাবাজ, রসিক এবং পরোপকারী। শাহবাগের ছবির হাট, আজিজ মার্কেট বা চারুকলা চত্বরের আড্ডায় তিনি ছিলেন মধ্যমণি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার ছিলেন, তেমনি অবহেলিত মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় ছিল সদা অবারিত। ১৯৮৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাতীয় জাদুঘরের সমকালীন শিল্পকলা বিভাগে কাজ করে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
শেষ বিদায় ও উত্তরসূরিদের দায়িত্ব
লালবাগের পোস্তা শ্মশান ঘাটে চিরবিদায় নেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়। তাঁর উত্তরসূরি ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি একটি বড় দায়িত্ব রয়ে গেছে—শিল্পীর স্টুডিওতে থাকা অসংখ্য কাজ ও ক্যানভাসগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা। তাঁর জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।



