লোকজ ঐতিহ্যের শেকড়ে ড. আশরাফ সিদ্দিকী: বংশলতিকায় স্বাধীনতা পুরস্কারের পূর্ণতা

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬

পরিবারের সদস্যদের সাথে এক বৃষ্টিস্নাত বিকেলের আড্ডায় শুরু হয়েছিল সেই ‘বাহাস’। বিষয় ছিল পূর্বপুরুষের পরিচয়। স্বনামধন্য লোক-গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী দাবি করেছিলেন, তাদের বংশের শুরু বাগদাদ থেকে আসা ধর্মপ্রচারক শেখ নান্নুর মাধ্যমে। সেদিন তরুণ প্রজন্মের সন্তানেরা যুক্তি আর তর্কের জালে বাবার সেই বিশ্বাসকে ‘মিথ’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পর সেই বিশ্বাসই সত্য হয়ে ধরা দিল একটি পুরনো বইয়ের পাতায় এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননায়।

হারিয়ে যাওয়া সেই ‘তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস’

ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মৃত্যুর পর তাঁর বিপুল গ্রন্থভাণ্ডার গোছাতে গিয়ে কন্যা তাসনিম সিদ্দিকী খুঁজে পান ১৯৩২ সালে প্রকাশিত আবদুল করিম খানের লেখা ‘তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস’ বইটি। যে বইটি নিয়ে কয়েক দশক আগে বাবার সঙ্গে সন্তানদের তুমুল তর্ক হয়েছিল। বইটির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এলাকার ‘ব্রাহ্মণ-শাসন’ গ্রামের নামকরণের ইতিহাস এবং শেখ নান্নুর অলৌকিক ও ত্যাগের কাহিনী।

বংশলতিকার গৌরবময় ইতিহাস

বংশলতিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, আশরাফ সিদ্দিকীর পূর্বপুরুষেরা কেবল ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না, তারা ছিলেন সেই অঞ্চলের সমাজ সংস্কারক।

  • শেখ নান্নু: বাগদাদ থেকে এসে ঘাটাইলে বসতি স্থাপন করেন এবং লাখেরাজ ভূমি প্রাপ্ত হন।

  • গোলাম মুর্তুজা: নায়েবে নাজিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, প্রজাস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তিনি আততায়ীর মন্ত্রপূত বাণে অকালে প্রাণ হারান। যার প্রতিদানে রানি ভবানী তাঁর পরিবারকে তিনটি ‘গড়’ উপহার দিয়েছিলেন।

  • পারিবারিক ঐতিহ্য: এই বংশেরই উত্তরসূরি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার আবদুল হামিদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

লোকসাহিত্যের আলোয় জীবনদর্শন

ড. আশরাফ সিদ্দিকীর কাছে লোকগাথা বা লোককাহিনি কেবল গবেষণার বিষয় ছিল না, এটি ছিল তাঁর যাপিত জীবনের অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির প্রকৃত ইতিহাস লুকিয়ে থাকে তার লোকঐতিহ্যের গভীরে। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেলেও তাঁর মনে একটি সূক্ষ্ম সাধ অপূর্ণ ছিল—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’।

অপূর্ণ সাধের পূর্ণতা: স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬

২০২০ সালের ১৯ মার্চ ৯৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান এই প্রথিতযশা গবেষক। তবে তাঁর সেই অপূর্ণ সাধ পূর্ণ হয়েছে ২০২৬ সালে। লোকসাহিত্য গবেষণা এবং সাহিত্যসৃষ্টিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬-এ ভূষিত করেছে।

বাবার এই প্রাপ্তিতে আবেগাপ্লুত কন্যা তাসনিম সিদ্দিকী বলেন,

“বাবা নিজ হাতে এই পুরস্কার দেখে যেতে পারলে হয়তো আরও বেশি খুশি হতেন। তবে তাঁর সন্তান হিসেবে এই সম্মান গ্রহণ করতে পেরে আমরা গর্বিত। তাঁর সারাজীবনের সাধনা আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণতা পেল।”

যুগ যুগ ধরে লোকসাহিত্যের যে মশাল ড. আশরাফ সিদ্দিকী জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, তাঁর সেই বংশলতিকার আলো আজ স্বাধীনতা পুরস্কারের উজ্জ্বলতায় এক নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত।