অচিন পাখি ও প্যারাডক্স: দর্শনের বিশ্বজনীন ব্যবচ্ছেদ

প্রাবন্ধিক: শরিফুল ইসলাম 

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬

জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শরিফুল ইসলাম আমাদের শেকড় এবং বিশ্বদর্শনের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তাঁর মতে, মৃত্যুর পর মানুষের আদর্শিক পরিচয়—সে লালনপন্থী নাকি কান্ট-ভক্ত—তা মাটির কাছে অর্থহীন হতে পারে, কিন্তু জীবিত সমাজের কাছে তার ফেলে যাওয়া ‘জীবনদর্শন’ অত্যন্ত মূল্যবান।

সত্যের ভৌগোলিক সীমানা নেই

লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদাহরণ টেনে একটি চমৎকার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে উপনিষদ ঘেঁষা বলে পর করে দিতে চান। কিন্তু লেখকের মতে, “সত্যের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না।” তিনি উদাহরণ দিয়েছেন—জার্মান পাম্প দিয়ে ক্ষেতে সেচ দিলেও ধান যেমন খাঁটি বাংলাদেশিই থাকে, তেমনি উপনিষদ থেকে রস নিলেও রবীন্দ্রনাথের সত্য আমাদেরই আত্মার অংশ। সত্য কারো একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

লালন ও কান্ট: ভিন্ন বেশে একই যুক্তি

লালন সাঁইকে আমরা কেবল একজন মরমী সাধক হিসেবে দেখি, কিন্তু লেখক তাঁকে একজন ‘ভয়ংকর যুক্তিবাদী’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। লালন যখন জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের জৈবিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, লেখক সেখানে ইমানুয়েল কান্টের ‘ক্রিটিক অফ পিওর রিজন’ বা বিশুদ্ধ যুক্তির প্রতিফলন খুঁজে পান। কোট-প্যান্ট পরা কান্ট আর আলখাল্লা পরা লালন—ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বসে আসলে একই পরম সত্যের ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

সমন্বয়ী বিশ্বদর্শন ও মানুষের সার্থকতা

প্রবন্ধের মূল সুর হলো সংমিশ্রণ। লেখক আরব, ইউরোপ বা যে কোনো প্রান্তের শ্রেষ্ঠ চিন্তাগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে মেশানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়:

  • কোরআনের ‘সমর্পণ’ এবং উপনিষদের ‘আত্ম-উপলব্ধি’—উভয়ই একই গন্তব্যের ইশারা।

  • নিজেকে না চিনলে স্রষ্টার কাছে সমর্পণ অর্থহীন।

উপসংহার

আমাদের এমন এক দর্শন প্রয়োজন যা মানুষকে ঘৃণা করতে শেখাবে না, বরং একজন মানুষকে আরও উদার ও মহৎ হতে সাহায্য করবে। রবীন্দ্রনাথ, লালন আর কান্ট—এঁরা কেউ একে অপরের প্রতিপক্ষ নন, বরং একই মিছিলে হাঁটা পথিক। মানুষের জন্ম তখনই সার্থক হবে, যখন সে পৃথিবীর সেরা চিন্তাগুলো ধারণ করে নিজের কাজের একটি গভীর ছাপ রেখে যেতে পারবে। সেই আলোর রেশ ধরেই আগামী দিনের মানুষ পথ খুঁজে পাবে।