জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৭:৪২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২৬
দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট ও আমদানির্ভিতার ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা। বক্তারা বলেন, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আজ বুধবার গ্রীনওয়াচ নিউজ ম্যাগাজিন ও অনলাইন পত্রিকার উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকে প্রধান বক্তা ছিলেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিসিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম জাকির হোসেন খান। সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন গ্রীনওয়াচ অনলাইন পত্রিকা সম্পাদক মোসত্মফা কামাল মজুমদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল হক, প্রতিবন্ধি মানুষের বিশ্ব সংগঠন ডিপিআই সভাপতি আব্দুস সাত্তার দুলাল, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজসহ প্রমূখ। বৈঠকে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
বক্তারা উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন সামগ্রী ও ব্যাটারির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় বর্তমানে এ খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তাদের মতে, সরকার ঘোষিত ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করলে ২০৩০ সালেই অর্জন করা সম্ভব।
বৈঠকের প্রধান বক্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন, কার্বন ট্যাক্স আরোপ করলে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন সম্ভব। পাশাপাশি কার্বন ট্রেডিং, যাকাত ও দানের মতো বিকল্প অর্থায়ন উত্স ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করলে এ খাতে এক ধরনের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
আলোচনায় উঠে আসে যে বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ বিদ্যুত্ উত্পাদন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যা বায়ুদূষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এর ফলে মানুষের গড় আয়ু ৬-৭ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে এবং প্রতি বছর এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জ্বালানির জন্য প্রায় ৫৬ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বক্তারা জানান, ২০২৪ সালে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ রয়েছে এবং শিল্প উত্পাদন সক্ষমতার ৩০-৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ভারতে মোট জ্বালানির প্রায় ৫১ শতাংশ নবায়নযোগ্য উত্স থেকে আসে এবং পাকিস্তানও তা বাড়িয়ে প্রায় ২৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। সেখানে বাংলাদেশে এ হার মাত্র ৫ শতাংশের মতো, যা উদ্বেগজনকভাবে কম। বক্তারা আরও বলেন, ট্যাক্স কাঠামোর জটিলতার কারণে আধুনিক সৌর প্রযুক্তি দেশে সহজে প্রবেশ করতে পারছে না। অথচ বিশ্বব্যাপী সৌরবিদ্যুত্ এখন সবচেয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানি উত্সগুলোর একটি। এ পরিস্থিতিতে ট্যাক্স নীতির সংস্কার জরম্নরি বলে তারা মত দেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমপ্রসারণে তারা কিছু বাসত্মবসম্মত প্রসত্মাবও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে, প্রতিটি স্কুল-কলেজের ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপন, গৃহভিত্তিক সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন উত্সাহিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুত্ উত্পাদন সক্ষমতা প্রায় ৩২ হাজার মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য উত্স থেকে এর অবদান ৫ শতাংশেরও কম। বক্তাদের মতে, বাজেটে জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বৈঠকে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি।




