বৈশ্বিক খাদ্য বিপর্যয়ের শঙ্কা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ছায়া ঢাকা থেকে কায়রোয়
তৌহিদুজ্জামান সোহান
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬
ইরান যুদ্ধের প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সারের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এই সংকটের ঢেউ এখন আছড়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের খাবারের থালায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক খাদ্যের ‘লাইফলাইন’
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের তীব্রতা এখন ঝুলে আছে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার এবং এক-চতুর্থাংশ তেল পরিবাহিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে অনমনীয় ভাব প্রকাশ করায় এবং ইরান বন্দর অবরোধের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় এই পথে নৌচলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এফএও-র মতে, এই প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে ‘খাদ্য বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে।
ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া
জাতিসংঘের তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানির দাম সরাসরি খাদ্যমূল্যে প্রভাব ফেলে। কারণ এসব দেশে পরিবারের মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয় পরিবহন ও খাদ্যের পেছনে। জ্বালানির দাম বাড়লে ঢাকা বা কায়রোর মতো শহরের নিম্নআয়ের মানুষ প্রোটিন ও সবজি ছেড়ে কেবল ক্যালরিসমৃদ্ধ সস্তা প্রধান খাবারে ঝুঁকতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টির হার বাড়িয়ে দেয়।
উৎপাদন খরচ ও সারের সংকট
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ার মূল কারণ হলো সারের দাম। এফএও-র অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সারের দাম গড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইনপুট কস্ট বা উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা চাষাবাদ কমিয়ে দিতে পারেন অথবা কম সার ব্যবহারের ফলে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
পরিসংখ্যান ও পূর্বাভাস
-
বিপজ্জনক দাম: ডব্লিউএফপি-র মতে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে।
-
শস্যের মজুত: আশার কথা হলো, ২০২৬ কৃষি মৌসুম শেষে বিশ্বে রেকর্ড ৯৫ কোটি ১৫ লাখ টন শস্যের মজুত থাকতে পারে, যা গত বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি।
-
মূল্যবৃদ্ধি: বর্তমানে খাদ্যমূল্য ২০২২ সালের তুলনায় ১১ শতাংশ কম থাকলেও ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক ২.৪ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক এলিজাবেথ রবিনসন মনে করেন, ২০০৮ সালের সংকটের মতো এখন পর্যন্ত বড় দেশগুলো রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, তাই অদূর ভবিষ্যতে তীব্র উল্লম্ফনের সম্ভাবনা কম। তবে জার্মান বিশেষজ্ঞ মাতিন কাইম সতর্ক করেছেন যে, আগামী মাসগুলোতে খাদ্য কেনা সাধারণ মানুষের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।



