জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: বোরো চাষির কপালে চিন্তার ভাঁজ, উৎপাদন হ্রাসের শঙ্কা

তাওসিফ মাইমুন 

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬

দেশের মানুষের খাদ্যের প্রধান উৎস চালের জোগান দিতে দিনরাত পরিশ্রম করেন যে কৃষক, এবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটে তাঁদের কপাল পুড়েছে। ক্রমাগত উৎপাদন খরচ বাড়লেও ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কৃষকরা নিঃস্ব হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই চলমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে আগামীতে দেশে খাদ্যসংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

উৎপাদন খরচ ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, বাংলাদেশের কৃষিযন্ত্রের সিংহভাগই ডিজেলচালিত। তেলের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে গ্যাসসংকটের কারণে সার উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় ফলন ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএইড-ও বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

মাঠে থাকা ফসলে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা

বর্তমানে বোরো মৌসুমের শেষভাগ চলছে। অনেক এলাকায় ধান কাটা শুরু হলেও অধিকাংশ জমিতে এখনো শেষ পর্যায়ের সেচ প্রয়োজন। সেচ দেওয়ার পাশাপাশি ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনে জ্বালানির বাড়তি দাম কৃষকের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, যেসব কৃষক সংকটের শুরুতে বাড়তি দামে ডিজেল কিনে সেচ দিয়েছেন, তারা ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দিহান।

কৃষকের আর্তনাদ: বিঘাপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার টাকা

লক্ষ্মীপুরের কৃষক রব মুন্সি জানান, ডিজেলসংকটে সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের ১৬ হাজার টাকার খরচ এবার বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের কৃষক সাইদুরের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। তিনি জানান, বীজধানের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি। গত বছর যে শ্রমিকের মজুরি ছিল ৬০০ টাকা, এবার তা দাঁড়িয়েছে ১২০০ টাকায়। শিলাবৃষ্টি ও জ্বালানি সংকটের দ্বিমুখী চাপে তাঁর ২২ কাঠা জমিতে এবার আবাদ কম হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ক্রমবর্ধমান চাল আমদানি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় চাল আমদানির পরিমাণ প্রতি বছর বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৩৩৪ টন চাল আমদানি হয়েছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ আরও বেড়ে ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪০৯ টনে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রকৃত কৃষকদের সরাসরি জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের কৃষি কাঠামো ভেঙে পড়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।