হরমুজ প্রণালিতে আটকা বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’

নেপথ্যে কি কূটনৈতিক টানাপোড়েন?

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতির বলি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে আটকা পড়েছে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনুমতি না পাওয়ায় ৩৭ হাজার টন সারবোঝাই জাহাজটি এখন গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।

দুই দফা ব্যর্থ চেষ্টা, আমিরাত উপকূলে অপেক্ষা

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজটি দুই দফায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। বর্তমানে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত এই জাহাজের সব নাবিকই বাংলাদেশি। এর গন্তব্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দর।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, জাহাজটি পার করার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তেহরানের অসন্তোষ ও কূটনৈতিক সমীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে সম্প্রতি ইরানে হামলা এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে তেহরানের অসন্তোষ। ঢাকার কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে যে, ওই ঘটনার পর বাংলাদেশের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ইরানকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন যে, বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তার মতে, জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত ছিল ইরানের ওপর হামলার সরাসরি নিন্দা জানানো। প্রথম বিবৃতিতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করায় ইরান বিষয়টিকে ‘একপেশে’ হিসেবে দেখছে।

প্রভাব পড়ছে জ্বালানি সরবরাহেও

এই সংকট কেবল ‘বাংলার জয়যাত্রা’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিল ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজের। কিন্তু ইরানের অনুমতি না মেলায় সেটিও যাত্রা শুরু করতে পারছে না। যদিও ইরান আগে আশ্বাস দিয়েছিল যে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ ছাড় পাবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রতিশ্রুতির সাথে মিলছে না।

উত্তরণের পথ

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক ভিত্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের বিষয়ে অবস্থানের অস্পষ্টতা থেকেই এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে সংকট নিরসনে ঢাকা ইতিমধ্যে তৎপরতা বাড়িয়েছে। তুরস্কে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সরাসরি সহায়তা চেয়েছেন।

এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই ‘বরফ’ কতটা দ্রুত গলে। কারণ হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।