প্রকৃতি ও সমুদ্রপ্রেমীদের স্বপ্নের গন্তব্য ফিলিপাইন
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৯, ২০২৬
সাত হাজারেরও বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ফিলিপাইনকে অনেকেই ‘প্রশান্ত মহাসাগরের রানী’ বলে অভিহিত করেন। নীলাভ সমুদ্র, সাদা বালুর সৈকত, রঙিন প্রবালপ্রাচীর, সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং মনোমুগ্ধকর দ্বীপপুঞ্জের কারণে দেশটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছেও ফিলিপাইনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
ভিসা ও ভ্রমণ প্রস্তুতি
বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিলিপাইন ভ্রমণের জন্য ভিসা নিতে হয়। সাধারণত অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পাসপোর্টে স্টিকার ভিসা প্রদান করা হয়। এছাড়া যাত্রার তিন দিন আগে অনলাইনে ই-ট্রাভেল ফরম পূরণ করা বাধ্যতামূলক, যা বিনামূল্যে সম্পন্ন করা যায়।
বর্তমানে ঢাকা থেকে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় সরাসরি ফ্লাইট নেই। তবে চায়না সাউদার্ন, থাই এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, এয়ার এশিয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ট্রানজিটের মাধ্যমে ম্যানিলায় যাত্রী পরিবহন করে। গন্তব্য ও রুটভেদে ট্রানজিটে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতে পারে।
কতদিন সময় প্রয়োজন?
ফিলিপাইনের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে অন্তত ১২ থেকে ১৫ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করা ভালো। কারণ দেশটি অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত হওয়ায় এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে অভ্যন্তরীণ বিমানই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
এয়ার এশিয়া, সেবু প্যাসিফিক এবং ফিলিপাইন এয়ারলাইন্স দেশটির জনপ্রিয় অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থা। ফেরি সার্ভিস থাকলেও সময় ও খরচের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটই বেশি সুবিধাজনক।
সমুদ্র ও রোমাঞ্চপ্রেমীদের স্বর্গ
ফিলিপাইনকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্কুবা ডাইভিং ও স্নরকেলিং গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে পর্যটকরা স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং, কায়াকিং, রাফটিংসহ বিভিন্ন জলক্রীড়ার সুযোগ পান।
স্বচ্ছ সমুদ্রজলে প্রবালপ্রাচীর, রঙিন মাছ এবং নানা ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে করে তোলে আরও স্মরণীয়। অনেক এলাকায় হোয়েল শার্কের সঙ্গে সাঁতার কাটার সুযোগও রয়েছে, যা পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অনন্য সমাহার
ফিলিপাইনের বোহল দ্বীপে দেখা মেলে বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র প্রাইমেট প্রাণী টারসিয়ারের। এছাড়া দেশটির বিভিন্ন দ্বীপে রয়েছে সংরক্ষিত বনভূমি, চুনাপাথরের পাহাড়, গুহা, জলপ্রপাত এবং বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী।
পালাওয়ান, এল নিডো, কোরন, সেবু, বোহল এবং বোরাকায় বিশ্বের সেরা পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব এলাকায় প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে।
খাবার ও সংস্কৃতি
ফিলিপিনোদের প্রধান খাদ্য ভাত। দেশটির জাতীয় খাবার ‘অ্যাডোবো’, যা সাধারণত মাংস ও ভাতের সমন্বয়ে পরিবেশন করা হয়। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য সি-ফুডের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে স্থানীয় খাবারে।
মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালাল খাবারের সুযোগও রয়েছে। জনপ্রিয় ফাস্টফুড চেইন ‘জলিবি’সহ বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে হালাল খাবার পাওয়া যায়। স্থানীয় বেকারিগুলোতেও তুলনামূলক কম দামে সুস্বাদু খাবার মিলবে।
ভ্রমণের সেরা সময়
ফিলিপাইনে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল থাকে, যদিও প্রকৃত অর্থে শীত অনুভূত হয় না। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়কে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়।
অন্যদিকে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা ও টাইফুন মৌসুম চলায় এ সময়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা না করাই ভালো। ঘূর্ণিঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাত অনেক সময় ভ্রমণে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা
ফিলিপাইনের বিভিন্ন দ্বীপে স্কুটি বা মোটরবাইক ভাড়া নিয়ে সহজেই ঘোরাঘুরি করা যায়। পর্যটকরা পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা রেখে স্বল্প খরচে স্কুটি ভাড়া নিতে পারেন।
এছাড়া দেশটির জনপ্রিয় গণপরিবহন ‘জিপনি’ পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। রঙিন নকশা ও ব্যতিক্রমী নকশার এসব যানবাহন ফিলিপাইনের সংস্কৃতিরই একটি অংশ।
ভাষা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই
স্পেনের দীর্ঘ উপনিবেশিক ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে ফিলিপাইনে ইংরেজি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সরকারি কর্মকর্তা, ইমিগ্রেশন কর্মী, দোকানদার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারেন। ফলে বিদেশি পর্যটকদের ভাষাগত সমস্যায় পড়তে হয় না।
সম্ভাব্য ভ্রমণ রুট
ম্যানিলা থেকে বোহল, অসলব, মোলবোল, সেবু, পালাওয়ান, এল নিডো এবং কোরন ঘুরে আবার ম্যানিলায় ফিরে আসা একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ রুট। যারা ডাইভিং ও সমুদ্রকেন্দ্রিক অ্যাডভেঞ্চারে আগ্রহী, তারা বোরাকায় বা তুব্বাহাতা রিফও ভ্রমণ পরিকল্পনায় যুক্ত করতে পারেন।
প্রকৃতি, সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য, রোমাঞ্চকর জলক্রীড়া এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সমন্বয়ে ফিলিপাইন সত্যিই এক অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকলে এই দ্বীপরাষ্ট্রের সফর হতে পারে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।



