মন ভালো রাখতে কোথায় যাবেন—পাহাড় নাকি সমুদ্র?

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২:৪২ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬

ভোর হতে তখনো কিছুটা বাকি, আকাশের বুকে লেগে আছে কালচে নীল অন্ধকারের শেষ রেশ। এমন এক হিমশীতল ভোরে কাঁপতে কাঁপতে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ইশা। চোখের সামনে মেঘের পাতলা চাদরে ঢাকা এক মায়াবী উপত্যকা। ঠিক তখনই দূরের দিগন্ত রাঙিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়ায় এসে পড়ল সূর্যের প্রথম সোনালি আলো। যেন কেউ এক মুঠো গলিত সোনা ছিটিয়ে দিল রুপোলি পাহাড়ে। শহরের ক্লান্তি, ধোঁয়া আর ব্যস্ততার বিষ যেন এক নিমেষেই ধুয়ে-মুছে বিলীন হয়ে গেল। বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস নিতেই মনে হলো—এই তো জীবন, এখানেই লুকিয়ে আছে পরম পূর্ণতা। পাহাড় আসলে এভাবেই মানুষকে তার নিজের ভেতরের আসল মানুষটার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়।

ভ্রমণপ্রেমীদের চিরন্তন এক প্রশ্ন—সমুদ্র নাকি পাহাড়? সমুদ্র মানুষকে উচ্ছ্বসিত করে, ঢেউয়ের তালে দৌড়াতে শেখায়; কিন্তু পাহাড় মানুষকে থামতে শেখায়, নিজেকে শুনতে শেখায়। আজকের এই তীব্র ব্যস্ত সময়ে মানুষ আসলে একটু শান্তির খোঁজেই পাহাড়ের পানে ছুটে যায়। কেউ যায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে, আবার কেউ যায় নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে। প্রতিদিনের চেনা শহরের হর্ন, ট্রাফিক জ্যাম আর ফোনের অবিরাম নোটিফিকেশনের ভিড়ে আমরা যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখন পাহাড়ের নীরবতা আমাদের এক অদ্ভুত মানসিক থেরাপি দেয়। সেখানে শহরের কোলাহল হারিয়ে গিয়ে স্থান করে নেয় ঝিঁঝি পোকার ডাক, দূরের পাহাড়ি ঝরনার শব্দ আর পাইন বনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মিষ্টি ফিসফিসানি।

পাহাড়ের বিশালতার সামনে দাঁড়ালে নিজের অজান্তেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। চারপাশের এই অসীম প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, তবে এই ছোট হওয়া কোনো অপমানের নয়—এটি এক পরম স্বাধীনতা। ক্যারিয়ার, সম্পর্ক কিংবা টাকার যে চিন্তাগুলো এতদিন বুকের ভেতর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সেগুলো হঠাৎ করেই খুব তুচ্ছ এবং ধুলোর মতো উধাও মনে হয়। পাহাড় জয় করা অবশ্য সহজ কিছু নয়; দীর্ঘ হাঁটা, ক্লান্তি আর বুক ফাটানো হাঁপ ধরা কষ্টের পরই মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত চূড়ার দেখা। তবে মেঘের ওপরে দাঁড়িয়ে যখন চারদিকের দিগন্ত বিস্তৃত রূপ চোখে পড়ে, তখন সেই মুহূর্তের সুখ কোনো বিলাসবহুল রিসোর্টের আরামকেও হার মানায়। কারণ এটি নিজের চেনা গণ্ডি ও সীমাবদ্ধতা পেরোনোর এক পরম আনন্দ।

পাহাড়ে গেলে যান্ত্রিক জীবনের সব অনুষঙ্গ ভুলে কয়েক ঘণ্টার জন্য ফোনটা দূরে রাখা উচিত। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে নয়, বরং নিজের চোখ দিয়ে প্রকৃতির এই ক্যানভাসকে উপভোগ করা, পাথরের রুক্ষতা ছোঁয়া আর পাহাড়ের আদিবাসীদের সহজ জীবনযাত্রা থেকে জীবনের সরল সমীকরণ শেখাটাই আসল ভ্রমণ। সমুদ্র যেখানে ঢেউ দিয়ে মানুষকে জড়িয়ে ধরে, পাহাড় সেখানে মানুষকে নীরব আশ্রয় দেয়। তাই জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে যদি কখনো মনে হয় আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন, তবে ব্যাগ গুছিয়ে আজই বেরিয়ে পড়ুন। পাহাড়ের কোনো এক নাম না জানা বাঁকে হয়তো আপনার হারিয়ে যাওয়া সেই চেনা পুরোনো হাসিটাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।