৩টি বিষয় প্রমাণ করলেই সহজে মিলবে আমেরিকান ভিসা

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

আমেরিকান ভিজিটর ভিসা (B1, B2) নিয়ে মানুষের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন হলো, “কি করলে আমেরিকান ভিসা নিশ্চিত হবে?” বাস্তবতা হলো, এই প্রশ্নের এক বাক্যের কোনো উত্তর নেই।  এমন কোনো নির্দিষ্ট চেকলিস্টও নেই যেখানে বলা আছে যে, এই কাজগুলো করলেই ভিসা নিশ্চিত।  আমেরিকান ভিসা মূলত আবেদনকারীর সামগ্রিক প্রোফাইল, উদ্দেশ্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে।  একজন ভিসা কর্মকর্তা সাধারণত তিনটি মৌলিক বিষয় খুঁজে দেখেন।  আপনি যদি এই তিনটি বিষয় বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

প্রথমত: আপনি যেদেশে স্থায়ীভাবে বাস করেন সেখানে কি আপনি প্রতিষ্ঠিত?
ভিসা কর্মকর্তাকে বোঝাতে হবে যে, আপনি বাংলাদেশে সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যক্তি।  অর্থাৎ আপনার একটি স্থায়ী চাকরি রয়েছে বা আপনি সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং আপনার আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে; আপনার পরিবার, সম্পদ বা দায়িত্ব বাংলাদেশে রয়েছে; আমেরিকায় ভ্রমণের খরচ বহনের সামর্থ্য আপনার আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিসা কর্মকর্তাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে, আপনার দেশে ফেরার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, কারণ, আপনি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত এবং আপনার জীবন, জীবিকা, পরিবার, সামাজিক বন্ধন এদেশেই।

দ্বিতীয়ত: আপনার কি আমেরিকায় যাওয়ার যৌক্তিক কারণ আছে?
আপনি কেন আমেরিকায় যেতে চান? এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই যৌক্তিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।  যদি আপনি পর্যটনের উদ্দেশ্যে যেতে চান, তাহলে আপনার ভ্রমণ ইতিহাস বা ট্রাভেল হিস্ট্রি এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  আপনি কি নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন? গত কয়েক বছরে কি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন?  নিজেকে একজন প্রকৃত ভ্রমণকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারলে সেটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, সবার ক্ষেত্রে ভ্রমণ ইতিহাস সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়।  উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে বা পড়াশোনা করে এবং আপনি তাকে দেখতে যেতে চান, তাহলে সেটিও একটি শক্তিশালী, যৌক্তিক ও স্বাভাবিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।  অর্থাৎ, আপনার ভ্রমণের উদ্দেশ্য এমন হতে হবে যা ভিসা কর্মকর্তা সহজেই গ্রহণযোগ্য মনে করবে।

তৃতীয়ত: আমেরিকায় ভ্রমণ শেষে আপনি কি নিজ দেশে ফিরে আসবেন?
আমেরিকান অভিবাসন আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো, ননইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয় যে তারা আমেরিকায় গিয়ে থেকে যেতে পারেন।  একজন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সেটি ঘটবে না তা প্রমাণ করার দায়িত্ব তার নিজের।  আপনাকে উপস্থাপন করতে হবে যে, আপনার সফরটি সাময়িক বা অস্থায়ী; নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের পর আপনি দেশে ফিরে আসবেন; আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার নেই।

সংক্ষেপে, আপনাকে তিনটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে হবে; আপনি কি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত?  আপনার কি আমেরিকায় ভ্রমণ করার যৌক্তিক কারণ আছে?  আপনি কি ভ্রমণ শেষে নিজ দেশে ফিরে আসবেন?

এই তিনটি বিষয় কীভাবে প্রমাণ করবেন?

এই তিনটি বিষয় প্রমাণ করার জন্য একজন আবেদনকারীর কাছে মূলত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম থাকে, DS-160 ফর্ম এবং ভিসা ইন্টারভিউ।

DS-160 ফর্ম
DS-160 ফর্ম ফর্ম পুরো আবেদন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।  অনেক আবেদনকারী এটিকে একটি সাধারণ তথ্য ফর্ম মনে করেন।  বাস্তবে এটি তার চেয়েও অনেক বেশি।  এই ফর্মের মাধ্যমে আপনি আপনার শিক্ষা, পেশা, আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক তথ্য, ভ্রমণ ইতিহাস এবং সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন।  সঠিকভাবে পূরণ করা হলে এই ফর্মই আপনাকে ভিসা কর্মকর্তার কাছে ভিসা পাওয়ার জন্য সম্ভাব্য যোগ্য প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করবে।  ভিসা আবেদনের প্রায় ৭০ শতাংশ গুরুত্ব বহন করে DS-160 ফর্ম।  তাই এটি সময় নিয়ে, বুঝে এবং প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্য বা অভিজ্ঞ কারও সহায়তায় সত্য, সঠিক ও বিস্তারিত তথ্য দিয়ে পূরণ করা উচিত।

ভিসা ইন্টারভিউ
ভিসা প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার।  সাধারণত সাক্ষাৎকারের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে, ১-২ মিনিট, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ মিনিটেরও কম।  এই অল্প সময়ের মধ্যেই আপনাকে আমেরিকায় ভ্রমণের উদ্দেশ্য, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তা আত্মবিশ্বাসের সাথে তুলে ধরতে হয়।
ইন্টারভিউতে ভিসা কর্মকর্তার প্রশ্নের সাথে সংগতিপূর্ণ প্রয়োজনীয়, সত্য ও সঠিক তথ্য দেয়া উচিত; আত্মবিশ্বাসী থাকা খুব জরুরী এবং আগে থেকেই গুছিয়ে কথা বলার অভ্যাস রপ্ত করতে পারলে এক্ষেত্রে তা ভীষণ সহায়ক হবে।  অনেকেই মনে করেন যে, ভিসা ইন্টারভিউ কোনো ভয়ংকর অগ্নিপরীক্ষা।  বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।  আপনি কোনো চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছেন না; আপনি একটি বৈধ উদ্দেশ্যে আমেরিকায় ভ্রমণের অনুমতি চাইছেন মাত্র।

কাগজপত্র নয়, তথ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ভিসা আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ ডকুমেন্ট সংগ্রহ নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন।  কে কোন কাগজ নিয়েছে, কতগুলো দলিল অনুবাদ করেছে, কী নোটারি করেছে এসব নিয়ে অনেকেই অকারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।  বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, ভিজিটর ভিসার ক্ষেত্রে ভিসা কর্মকর্তা সাধারনত কোনো ডকুমেন্টই দেখতে চান না, তিনি ভিসা আবেদনকারীর উত্তর ও যুক্তি শুনতে চান।  প্রয়োজন হলে, ভিসা কর্মকর্তা নিজেই নির্দিষ্ট কাগজপত্র চাইবেন।  যদিও খুব একটা প্রয়োজন হয় না, তবুও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ইন্টারভিউতে যাওয়া উত্তম, তাই বলে আবার ফাইল যাতে খুব বড় বা ভারী না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

মনে রাখতে হবে, আমেরিকান ভিজিটর ভিসা পাওয়ার কোনো শর্টকাট নেই।  তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, আপনি যদি বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে পারেন যে আপনি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল, আপনার ভ্রমণের যৌক্তিক কারণ আছে এবং ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে আসবেন, তাহলে আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবলভাবে বেড়ে যাবে।

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস, ঢাকা