বিদেশে নির্যাতন, দেশে ফিরেও অপমানের শিকার নারী শ্রমিকেরা

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:৫৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬

বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়ে নির্যাতন, প্রতারণা ও শোষণের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন অনেক বাংলাদেশি নারী শ্রমিক। কিন্তু দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করার বদলে তাঁদের অনেককে মোকাবিলা করতে হচ্ছে সামাজিক অবজ্ঞা, পারিবারিক সন্দেহ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিদেশের নির্যাতনের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই সমাজের নেতিবাচক আচরণ তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

ভুক্তভোগী নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে ফিরে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও অনেক সময় সহমর্মিতার বদলে শুনতে হয় নানা প্রশ্ন ও কটূক্তি। ফলে অনেকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নরসিংদীর রনি বেগম সৌদি আরবে গিয়েছিলেন পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেখানে কাজ না পাওয়া, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি।

রনি বেগমের ভাষ্য, বিদেশে যাওয়ার চেয়ে দেশে ফিরে মানুষকে নিজের পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কেন তিনি ফিরে এসেছেন, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে দূরত্বও তৈরি করেন।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সাতক্ষীরার সুমি বেগম। তাঁর অভিযোগ, সৌদি আরবে কাজ করেও দীর্ঘ সময় বেতন পাননি। দেশে ফেরার পরও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি তিনি। সংসারের প্রয়োজনে বিদেশে কাজ করতে গেলেও সমাজের অনেকের কাছ থেকে নেতিবাচক আচরণের শিকার হচ্ছেন বলে জানান সুমি।

সুনামগঞ্জের তাহিরুন্নেসাও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনের আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার পর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সংকটে পড়েন। তাঁর দাবি, আত্মীয়স্বজনের অনেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলেন। সামাজিক অনুষ্ঠানেও আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

পুনর্বাসনের নীতিমালা, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকার ‘প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। নীতিমালায় প্রত্যাগত কর্মীদের পুনর্বাসন, নারী কর্মীদের প্রতি বৈষম্য দূর করা এবং সমাজে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায় না। ফলে দেশে ফিরে কর্মসংস্থান, আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

দুই বছরে বিদেশে গেছেন ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি নারী

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ১ লাখ ৭২ হাজার ২০৮ জন নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন সৌদি আরবে, প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার। এ ছাড়া জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন ও কুয়েতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজের জন্য গেছেন।

তবে এ সময়ে কতজন নারী শ্রমিক নির্যাতন বা প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন এবং তাঁদের কতজন পুনর্বাসন পেয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।

প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রত্যাগত নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও ঝুঁকিতে থাকা নারীদের স্বাবলম্বী করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের পুনর্বাসনে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, প্রয়োজন নিরাপদ কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীদের দেশে ফিরে যেন নতুন করে অপমান ও বৈষম্যের মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা জরুরি।

বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া কোনো নারীর ব্যর্থতা নয়। তাঁদের প্রতি সন্দেহ বা অবজ্ঞা নয়, বরং সহমর্মিতা ও সহযোগিতাই পারে নতুন করে জীবন গড়ার পথ সহজ করতে।