প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে শক্তিশালী হচ্ছে দেশের অর্থনীতি

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:৫৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগের মাস জুলাইয়ে এসেছিল প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় আগস্টে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও পরিবর্তন এসেছে। আগস্ট শেষে দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাসীদের পাঠানো ডলারের বড় অংশ আমদানি ব্যয় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও এসব ডলার লেনদেন করা হয়।

প্রবাসী আয় দেশে এলে ব্যাংক গ্রাহককে সমপরিমাণ টাকা পরিশোধ করে। একই সময়ে ব্যাংকের হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে আমদানিকারকদের ঋণপত্রের (এলসি) বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন বৈদেশিক দায় মেটাতে এসব ডলার ব্যবহার করা হয়।

কোনো ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ডলার থাকলে তা অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা যায়। আবার বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে রিজার্ভে যুক্ত করতে পারে।

এরই অংশ হিসেবে গত ১ সেপ্টেম্বর চারটি ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে বাজারে ডলারের চাহিদা বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রিও করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রায় ১৪ মাস পর উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের চাহিদাও বেশি

রেমিট্যান্স বাড়লেও দেশের আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আমদানি বিল দাঁড়িয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে জ্বালানি আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ১৩৭ কোটি ডলার। এক বছর আগের তুলনায় এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৮৩ শতাংশের বেশি।

অন্যদিকে জুলাইয়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমে ৪৩৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ফলে রেমিট্যান্স থেকে আসা অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানি ব্যয় পরিশোধে ব্যবহার হচ্ছে।

বছরজুড়ে ওঠানামার পর রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে। জুলাইয়ে সামান্য কমার পর আগস্টে রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স বাড়লেই তার পুরোটা রিজার্ভে যুক্ত হয় না। কারণ, একই সময়ে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ করতে হয়। তবে এসব ব্যয় মেটানোর পরও বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত সরবরাহ রিজার্ভের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক মনে করেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে।

তাঁর মতে, রেমিট্যান্সের অর্থ শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে বিনিয়োগ করা গেলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।