ভিসা প্রত্যাখ্যান ও শিক্ষার্থীসংকটে আর্থিক চাপে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার, আবেদন ফি বৃদ্ধি এবং অভিবাসননীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে দেশটিতে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন অনেক শিক্ষার্থী। এতে আর্থিক সংকটে পড়ছে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোথাও কর্মী ছাঁটাই, আবার কোথাও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা বিভাগের অক্টোবরের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা আসনের গড়ে মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে পেরেছে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি তাদের বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি আসন পূরণ করতে পেরেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ই বড় শহরে অবস্থিত। তুলনামূলকভাবে বেশি সংকটে রয়েছে আঞ্চলিক এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
আয় কমেছে কোটি কোটি ডলার
নিউ সাউথ ওয়েলসের চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির পরিস্থিতি সংকটের একটি উদাহরণ। চলতি বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আসনের মাত্র ৪০ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের তুলনায় সেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। করোনা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র এক-পঞ্চমাংশে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা মাইক ফার্গুসনের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের আয় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মী ছাঁটাই ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফার্গুসনের মতে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার এবং আবেদন ফি বৃদ্ধি বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ভিসার আবেদন ফি ২ হাজার ৫০০ ডলার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও এই অর্থ ফেরত পাওয়া যায় না। মাইক ফার্গুসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার আবেদনকারীদের প্রায় ৫৩ শতাংশের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
ফলে ভিসার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করেও অনুমোদন না পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছেন।
বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় যান। ভিসাপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও বাড়তি ব্যয় তাঁদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
প্রভাব পড়ছে বড় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়েও
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে সিডনির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক জর্জ উইলিয়ামস জানিয়েছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সেবা চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণায় ব্যয় করে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থী কমে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উইলিয়ামসের মতে, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। পড়াশোনা শেষে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কেমন হবে, তা নিয়েও অনেক শিক্ষার্থী নতুন করে ভাবছেন।
দক্ষ কর্মীর সংকট বাড়ার আশঙ্কা
একই ধরনের সংকটে রয়েছে ভিক্টোরিয়ার ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য ডানকান বেন্টলি আঞ্চলিক এলাকার জন্য বিশেষ দক্ষতাভিত্তিক স্টুডেন্ট ভিসা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষকতার মতো যেসব পেশায় কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেসব বিষয়ে পড়তে আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউডও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, আঞ্চলিক এলাকায় বিদেশি শিক্ষার্থী কমতে থাকলে ভবিষ্যতে নার্সিং, শিশু পরিচর্যা, প্রবীণদের সেবা ও প্রকৌশল খাতে দক্ষ কর্মীর সংকট আরও বাড়তে পারে।
নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্য নিয়েও অনিশ্চয়তা
অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬ সালের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পিত সংখ্যা নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৯৫ হাজার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বছর শেষে নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে সীমিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে স্টুডেন্ট ভিসা ব্যবস্থায় নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে সরকার। গত ২ অক্টোবর থেকে অধিকাংশ অস্থায়ী ভিসাধারীর অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে অবস্থান করে নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার সুযোগ বন্ধ হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ছাড় থাকলেও শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিরোধী জোট ক্ষমতায় গেলে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি বছরে ২ লাখ ৪০ হাজারে সীমিত করার পরিকল্পনা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ভিসানীতি, বাড়তি ব্যয় ও শিক্ষার্থীসংকট অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশঙ্কা, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকলে আর্থিক সংকট আরও গভীর হবে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, গবেষণা এবং আঞ্চলিক এলাকার কর্মসংস্থানেও।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়া



