দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণে কত টাকা লাগে?

খরচ বাঁচানোর ১০ কার্যকর কৌশল

জুনায়েদ আজিম চৌধুরী

জুনায়েদ আজিম চৌধুরী

প্রকাশিত: ১:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২৬

বাংলাদেশি ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে দক্ষিণ কোরিয়া এখন ক্রমেই জনপ্রিয় একটি গন্তব্য।  কে-পপ, কে-ড্রামা, আধুনিক নগরজীবন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, পাহাড়, সমুদ্র ও সুস্বাদু খাবারের অনন্য সমন্বয় দেশটিকে পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তবে অনেকের ধারণা, দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ মানেই বিশাল বাজেট।  বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। সঠিক পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি এবং কিছু কৌশল জানা থাকলে তুলনামূলক কম খরচেও সিউল, বুসানসহ দেশটির জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখা সম্ভব।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরে আসা ভ্রমণকারী জুনায়েদ আজিম চৌধুরীর অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরা হলো খরচ কমানোর ১০টি কার্যকর উপায়।

১. ভিসা নিজেই করুন

দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা করতে অনেকেই ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা নেন। তবে চাইলে নিজেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

বর্তমানে সরকারি ফিসহ প্রায় ৫ হাজার টাকার মধ্যেই ভিসার আবেদন করা যায়।  অথচ একই কাজের জন্য অনেক ট্রাভেল এজেন্সি অতিরিক্ত সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নেয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা পোর্টালে অনলাইনে আবেদনপত্র পূরণ করে সেটি প্রিন্ট করতে হয়।  এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ঢাকায় অবস্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসে জমা দিতে হয়।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে গত তিন বছরের আয়কর রিটার্নের নথি, যা কোরিয়ার ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

বর্তমানে আবেদন জমা দেওয়ার জন্য আলাদা অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রয়োজন হয় না।  সব নথি প্রস্তুত থাকলে কার্যদিবসে সরাসরি আবেদন করা যায়।  সাধারণত ৩ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

২. বিমান টিকিট আগে বুক করুন

দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সবচেয়ে বড় ব্যয়গুলোর একটি বিমানভাড়া।

সাধারণত ভ্রমণের ২ থেকে ৪ মাস আগে টিকিট বুক করলে সবচেয়ে ভালো মূল্য পাওয়া যায়।  শেষ মুহূর্তে টিকিট কিনলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিলের চেরি ব্লসম মৌসুম এবং অক্টোবর-নভেম্বরের শরৎকাল পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়।  এ সময় ঢাকা-সিউল রিটার্ন টিকিটের দাম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে অফ-সিজনে একই রুটে ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যেও টিকিট পাওয়া সম্ভব।  বিশেষ করে চায়না ইস্টার্ন, চায়না সাউদার্ন কিংবা এয়ার চায়নার মতো এয়ারলাইনসে তুলনামূলক কম ভাড়ায় ভ্রমণের সুযোগ থাকে।

৩. সিউল ঘোরার ‘ম্যাজিক কার্ড’

সিউলে কম খরচে ভ্রমণের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো ‘ডিসকভার সিউল পাস’।

এই কার্ড ব্যবহার করে ইনচন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিউল শহরে আসার ট্রেন বা বাস সুবিধা, ৭০টিরও বেশি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে বিনা মূল্যে প্রবেশ এবং হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায়।

অনলাইনে ৩ থেকে ৫ দিনের প্যাকেজ কিনতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

এর পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট কার্ড’ ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় পাঁচ দিন ধরে আনলিমিটেড মেট্রো ও সিটি বাসে চলাচল করা যায়।  একই কার্ডে সিউলের জনপ্রিয় পাবলিক বাইক সার্ভিসও ব্যবহার করা সম্ভব।

৪. কোথায় থাকবেন?

সিউলে পর্যটকদের সবচেয়ে জনপ্রিয় এলাকা মিয়ংডং।  তবে জনপ্রিয়তার কারণে এখানকার হোটেল ভাড়াও তুলনামূলক বেশি।

বাজেট বাঁচাতে চাইলে হংডে এলাকায় থাকা ভালো বিকল্প হতে পারে।  বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ট্রেন সংযোগ রয়েছে, পাশাপাশি ক্যাফে, স্ট্রিট ফুড ও প্রাণবন্ত পরিবেশও পাওয়া যায়।

ডংডাইমুন এলাকাও কম খরচে থাকার জন্য জনপ্রিয়।  আর বুসানে সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি থাকতে চাইলে হেউন্ডে ভালো পছন্দ হলেও আরও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে সোমইয়ন এলাকা বিবেচনা করা যেতে পারে।

৫. পানি ও খাবারে সাশ্রয়

ভ্রমণের সময় ছোট ছোট খরচই অনেক সময় বড় অঙ্কে পৌঁছে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ হোটেল, মেট্রো স্টেশন ও বিভিন্ন পাবলিক স্থানে বিনা মূল্যে পানির ব্যবস্থা রয়েছে।  তাই সঙ্গে একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল রাখলে আলাদা করে বোতলজাত পানি কিনতে হয় না।

খাবারের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা করলে খরচ অনেক কমানো সম্ভব।  সাধারণ রেস্টুরেন্টে এক বেলার খাবারে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোরীয় ওন পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

তবে সিউলের মিয়ংডং, হংডে কিংবা বুসানের বিভিন্ন স্ট্রিট ফুড মার্কেটে মাত্র ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার ওনের মধ্যেই জনপ্রিয় অনেক কোরীয় খাবার পাওয়া যায়।

৬. শহর থেকে শহরে যাওয়ার সাশ্রয়ী উপায়

দক্ষিণ কোরিয়ায় এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার দ্রুততম মাধ্যম কোরিয়া ট্রেন এক্সপ্রেস (কেটিএক্স)।

তবে এটি তুলনামূলক ব্যয়বহুল।  বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এক্সপ্রেস বাস অনেক ভালো বিকল্প হতে পারে।  এসব বাস আরামদায়ক, সময়নিষ্ঠ এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী।

একই সঙ্গে দৈনন্দিন চলাচলে ট্যাক্সির বদলে মেট্রো ও সিটি বাস ব্যবহার করলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

৭. কেনাকাটায় ভরসা ডাইসো

কম খরচে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় রিটেইল চেইন ‘ডাইসো’ পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

এখানে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার কোরীয় ওনের মধ্যেই ট্রাভেল সামগ্রী, চার্জার অ্যাডাপ্টর, ছাতা, পানির বোতল, স্টেশনারি, স্কিনকেয়ার পণ্য কিংবা ছোটখাটো উপহারসামগ্রী পাওয়া যায়।

৮. একদিনে কাছাকাছি জায়গা ঘুরুন

পরিকল্পনাহীনভাবে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাতায়াত করলে সময় ও অর্থ—দুটিই অপচয় হয়।

তাই কাছাকাছি অবস্থিত দর্শনীয় স্থানগুলো একই দিনে ঘোরার পরিকল্পনা করা ভালো।  যেমন মিয়ংডং, নামসান ও ডংডাইমুন একদিনে দেখা সম্ভব।  একইভাবে হংডে ও ইতেওনও কাছাকাছি হওয়ায় একসঙ্গে ঘোরা যায়।

৯. ফ্রি ভিউ পয়েন্ট ও পার্ক ঘুরে দেখুন

দক্ষিণ কোরিয়ায় অনেক আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে যেখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না।

সিউলের হ্যান নদীসংলগ্ন পার্ক, নামসান পার্কের হাঁটার পথ, বুসানের গামচিওন কালচার ভিলেজের আশপাশের ভিউ পয়েন্ট কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী ওয়াকওয়েগুলো পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত।

এসব জায়গায় ঘুরে স্থানীয় জীবনধারা ও শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় একেবারে বিনা খরচে।

১০. প্রয়োজনীয় অ্যাপ আগে থেকেই ডাউনলোড করুন

দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘোরাঘুরির সময় সঠিক ম্যাপ ও পরিবহন অ্যাপ ব্যবহার করলে অপ্রয়োজনীয় খরচ অনেক কমে যায়।

দেশটিতে গুগল ম্যাপস সব সময় নির্ভুল তথ্য দেয় না।  তাই স্থানীয়দের মতো Naver Map ব্যবহার করাই ভালো।  এতে রিয়েল-টাইম বাস, মেট্রো, হাঁটার পথ ও ট্রাফিক তথ্য পাওয়া যায়।

এ ছাড়া KakaoMetro অ্যাপ ব্যবহার করলে মেট্রোর রুট, ট্রান্সফার স্টেশন ও ট্রেনের সময়সূচি সহজে বোঝা যায়।

মোটামুটি কত টাকা লাগতে পারে?

অফ-সিজনে পরিকল্পিতভাবে ভ্রমণ করলে একজন বাংলাদেশি পর্যটকের ৫ থেকে ৭ দিনের দক্ষিণ কোরিয়া সফরে বিমানভাড়া, ভিসা, আবাসন, স্থানীয় যাতায়াত, খাবার ও দর্শনীয় স্থান মিলিয়ে আনুমানিক ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে ভ্রমণ সম্পন্ন করা সম্ভব।

তবে ভ্রমণের সময়, হোটেলের মান, কেনাকাটা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে মোট খরচ আরও বাড়তে বা কমতে পারে।

সঠিক পরিকল্পনা, আগাম বুকিং এবং স্থানীয় সুবিধাগুলোর কার্যকর ব্যবহার জানলে দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ মোটেও অসম্ভব বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল নয়।  বরং বাজেটের মধ্যেই আধুনিক ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়া দেশটি উপভোগ করা সম্ভব।

 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো