ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থী কিশোরদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৭:৫৬ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬
ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থী ও অভিভাবকহীন বিদেশি কিশোর-কিশোরীদের জন্য শিক্ষাজীবন শুরু করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন এক সংগ্রামের নাম। বিশেষ করে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী যেসব কিশোর নিজেদের অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শিক্ষা শুধু তাদের ভবিষ্যৎ গঠনের পথই নয়; বরং ফরাসি সমাজে একীভূত হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একই সঙ্গে স্কুলে যাওয়া তাদের জন্য রাস্তার অনিশ্চিত জীবন থেকে সাময়িক মুক্তি এবং ভবিষ্যতে বহিষ্কারের ঝুঁকি কমানোরও একটি উপায়।
স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা
প্যারিসের গার দ্য লিঁও স্টেশনের কাছে অবস্থিত ‘দ্রোয়া-আ-লেকোল’ সংস্থার পরিচালিত ‘স্কুলহীনদের স্কুল’-এ প্রতিদিনের মতো ফরাসি ভাষার ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসে ১৬ বছর বয়সী গিনির নাগরিক মেহদি।
ফরাসি ভাষার সাম্প্রতিক পরীক্ষায় ভালো ফল করায় সে আশাবাদী। তার স্বপ্ন, খুব শিগগিরই ফরাসি উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হবে।
একই প্রত্যাশা ১৭ বছর বয়সী কঙ্গোলিজ তরুণ ত্রেজোরেরও। তারা দুজনই বিশ্বাস করে, আগামী শিক্ষাবর্ষে কোনো না কোনো স্কুলে জায়গা হবে তাদের।
তবে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় বসে না থেকে তারা প্রতিদিনই ‘স্কুলহীনদের স্কুল’-এ আসে, যাতে শেখা বিষয়গুলো ভুলে না যায় এবং নিজেদের আরও প্রস্তুত করতে পারে।
নাবালক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ার জটিলতা
মেহদি ও ত্রেজোরের পরিস্থিতি আরও সহজ হতে পারত যদি ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে স্বীকৃতি দিত।
সেক্ষেত্রে শিশু কল্যাণ সংস্থা ‘এইড সোশিয়াল আ লঁফঁস’ (ASE) তাদের দায়িত্ব নিত এবং স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করত।
কিন্তু দুজনকেই প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মেহদির অভিযোগ, “আমার বয়স ১৬ বছর হলেও কর্তৃপক্ষ তা বিশ্বাস করছে না। ফলে আমি কোনো ধরনের সুরক্ষা পাচ্ছি না।”
বর্তমানে তারা আদালতে আপিল করেছে এবং বিচারকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
ভর্তি প্রক্রিয়ায় অসংখ্য বাধা
ফ্রান্সে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থীর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার জন্য বৈধ আবাসন অনুমতির প্রয়োজন না হলেও প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল।
প্রথমে নবাগত অ-ফরাসিভাষী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্র CASNAV-এ নিবন্ধন করতে হয়। এরপর ফরাসি ভাষা ও গণিতে মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।
শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাইয়ের পর তাকে উপযুক্ত শ্রেণিতে পাঠানো হয়।
এ ছাড়া জন্মসনদ, ঠিকানার প্রমাণপত্রসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এসব প্রক্রিয়ার সময় একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
মেহদি বলেন, “সংস্থার সহায়তা না থাকলে আমি হয়তো অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিতাম।”
ত্রেজোরের ভাষায়, “সবকিছু এত জটিল যে একা এগিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।”
দীর্ঘ অপেক্ষা ও ধীরগতির প্রশাসন
‘দ্রোয়া-আ-লেকোল’ সংস্থার কর্মীরা বলছেন, অনেক তরুণ জানেই না কীভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।
সংস্থাটির কর্মী রোজ জানান, মূল্যায়ন পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্কুলে ভর্তি করা হয় না। শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন ভর্তি সম্ভব হয় না।
ফলে অনেককে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এই দীর্ঘ সময়টুকু কাজে লাগাতেই ‘স্কুলহীনদের স্কুল’ পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ভর্তি হলেও শেষ হয় না সংকট
স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরও এসব তরুণের আর্থিক সমস্যা থেকে যায়।
পরিবহন ব্যয়, ক্যান্টিন, শিক্ষা সফর, বই-খাতা কিংবা অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ অনেকেরই থাকে না।
ফলে শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তারা ১২৮ জন তরুণকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে আরও অনেক শিক্ষার্থী অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে।
প্যারিসের বাইরে পরিস্থিতি আরও কঠিন
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, প্যারিসে কিছু সহায়তামূলক ব্যবস্থা থাকলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল।
উত্তর ফ্রান্সের লিলসহ বিভিন্ন শহরে অনেক ক্ষেত্রে আদালতের অস্থায়ী অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত আদেশ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিতে অনীহা দেখানো হয়।
ফলে যেসব কিশোরের বয়সসংক্রান্ত আবেদন এখনও বিচারাধীন, তাদের জন্য স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্কুল মানে কয়েক ঘণ্টার স্বস্তি
এই তরুণদের কাছে স্কুল কেবল শিক্ষার স্থান নয়, মানসিক আশ্রয়ও।
প্যারিসের একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী মেহদি বলেন, “ক্লাসে গেলে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য সব দুশ্চিন্তা ভুলে থাকা যায়।”
ত্রেজোরও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “পড়াশোনা না থাকলে মানুষ শুধু চিন্তা করতেই থাকে।”
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ অভিভাবকহীন কিশোর বর্তমানে রাস্তায়, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বা অনিশ্চিত বাসস্থানে বসবাস করছে।
সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সময় নষ্ট হওয়া।
অনেক কিশোর শেষ পর্যন্ত আদালতের মাধ্যমে নাবালক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তার আগে তাদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়।
ফরাসি বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি কিশোরকে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কারিগরি প্রশিক্ষণ বা পেশাগত শিক্ষায় যুক্ত হতে না পারলে ভবিষ্যতে বৈধ আবাসন অনুমতির আবেদন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে
সব বাধা, অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেও এসব তরুণ তাদের স্বপ্ন হারিয়ে ফেলেনি।
মেহদি ভবিষ্যতে স্থপতি হতে চায়। বিকল্প হিসেবে ওয়েল্ডিং বা নির্মাণ খাতেও কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তার।
ত্রেজোরের ইচ্ছা বাণিজ্য, লজিস্টিকস অথবা বিদ্যুৎ প্রযুক্তি বিষয়ে কারিগরি শিক্ষা নেওয়ার।
তাদের বিশ্বাস, একদিন তারা সফল হবে এবং পরিবারকে জানাতে পারবে—সব বাধা পেরিয়েও তারা নতুন জীবনের পথে এগিয়ে গেছে।



