অভিবাসন নীতি: ১২ জুন থেকে ফ্রান্সে যেসব বড় পরিবর্তন কার্যকর হলো

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ৮:০২ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

১২ জুন ২০২৬ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন ‘মাইগ্রেশন ও অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’ আজ ১২ জুন থেকে ফ্রান্সে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।  ইউরোপজুড়ে আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রণীত এই চুক্তির ফলে ফ্রান্সের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ আশ্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের রূপান্তর এসেছে।  ইনফোমাইগ্রেন্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরাসি সীমান্তে আশ্রয় আবেদন, আইনি প্রক্রিয়া, ডাবলিন বিধি এবং ডেটাবেজ সিস্টেমে যে প্রধান পরিবর্তনগুলো এসেছে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

সীমান্তে বাধ্যতামূলক ‘ফিল্টারিং’ ও ট্রানজিট জোন

১২ জুন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো দেশের নাগরিক অনিয়মিতভাবে ফ্রান্সে প্রবেশ করে আশ্রয় আবেদন করলে, তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ফিল্টারিং’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

  • কোথায় হবে: ফ্রান্সে এই প্রক্রিয়া মূলত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে পরিচালিত হবে।  যেমন— বৃহত্তর প্যারিসের রোয়াসি শার্ল দ্য গল বিমানবন্দর, অর্লি বিমানবন্দর এবং বুভে এয়ারপোর্ট।

  • ভূখণ্ডে প্রবেশের অধিকারহীনতা: ফিল্টারিং চলাকালে (সর্বোচ্চ ৭ দিন) আবেদনকারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সে প্রবেশ করেছে বলে গণ্য করা হবে না।  তাকে সীমান্তসংলগ্ন ট্রানজিট জোনে থাকতে হবে।  এই সময়ে তার পরিচয়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা যাচাই করা হবে।

১২ সপ্তাহের ‘সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়া’

ফিল্টারিং শেষে যাদের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম (ইইউ পর্যায়ে যাদের দেশের নাগরিকদের আবেদন অনুমোদনের হার ২০% বা তার কম, যেমন— ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, গ্যাবন ও তানজানিয়া), কিংবা যারা নিরাপত্তা ঝুঁকি—তাদের ‘সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়া’র আওতায় আনা হবে।

  • এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারী ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশ ছাড়াই সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ একটি অস্থায়ী কেন্দ্রে থাকবেন এবং ভিডিও কনফারেন্স বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দ্রুত আবেদন পরীক্ষা করা হবে।

  • আবাসন সংকট ও হোটেলের ব্যবহার: ফরাসি পরিকল্পনা অনুযায়ী এমন ৬১৫টি স্থান থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রায় ৩০০টি স্থান প্রস্তুত রয়েছে।  ঘাটতি মেটাতে রোয়াসি বিমানবন্দরের আশপাশের হোটেলগুলো ব্যবহার করা হবে, তবে সেখানে পুলিশি পাহারা না থাকায় ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফরাসি অভিবাসন দপ্তরের (অফি) প্রধান দিদিয়ে লেসচি।

ফ্রান্সের অভ্যন্তরেও কার্যকর হতে পারে ফিল্টারিং

নতুন নিয়মে কেবল সীমান্তেই নয়, ফ্রান্সের ভেতরে অনিয়মিত অবস্থায় পুলিশের তল্লাশিতে ধরা পড়া কোনো ব্যক্তি যদি সেখানে আশ্রয় চান (যেমন— রেন বা অন্য কোনো শহরে), তবে তাকেও ট্রানজিট এলাকায় পাঠিয়ে এই ৭ দিনের ফিল্টারিং প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হতে পারে।

আপিল নিষ্পত্তির আগেই বহিষ্কার (ওকিউটিএফ)

সবচেয়ে বড় আইনি পরিবর্তন এসেছে আপিল প্রক্রিয়ায়।  সীমান্তে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আবেদনকারীকে সরাসরি ‘সীমান্ত প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া’র আওতায় সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ অপেক্ষা এলাকায় রাখা হবে (প্রশাসনিক আটককেন্দ্রে নয়)।  সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো—আগে ফরাসি জাতীয় আশ্রয় আদালতে (সিএনডিএ) আপিল করলে বহিষ্কার কার্যক্রম সাধারণত স্থগিত থাকত।  কিন্তু এখন নতুন নিয়মে, আপিলের চূড়ান্ত রায় আসার আগেই দেশত্যাগের নির্দেশ (OQTF) সরাসরি কার্যকর করা যেতে পারে।

‘রিটার্ন হাব’ ও ‘তৃতীয় দেশে আশ্রয় স্থানান্তর’ নিয়ে ফ্রান্সের অনীহা

ইইউর নতুন নিয়ম অনুযায়ী নিরাপদ তৃতীয় দেশে বা ইউরোপের বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ তৈরি করে প্রত্যাখ্যাতদের পাঠানোর সুযোগ থাকলেও ফ্রান্স তা করবে না।  ফরাসি সাংবিধানিক পরিষদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে প্রতিটি আশ্রয় আবেদন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।  ফলে সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতার কারণে ফ্রান্স ইইউ-এর বাইরে কোনো দেশে আশ্রয় প্রক্রিয়া স্থানান্তর করবে না এবং রিটার্ন হাব ব্যবহারে তাদের অনীহা রয়েছে।

ডাবলিন বিধির কড়াকড়ি ও নোটিফিকেশন সিস্টেম

ডাবলিন নীতি (প্রথম যে ইইউ দেশে প্রবেশ করবেন, সেই দেশই আশ্রয় আবেদন দেখবে) বহাল থাকলেও এর মেয়াদে ও ফেরত নেওয়ার পদ্ধতিতে বদল এসেছে।

  • প্রথম দেশের দায়িত্বের মেয়াদ ১২ মাস থেকে বাড়িয়ে ২০ মাস করা হয়েছে।

  • সহজ প্রক্রিয়া: অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তানিয়া রাশোহর মতে, আগে কোনো দেশ থেকে ব্যক্তিকে ফেরত নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠাতে হতো।  এখন শুধু একটি ‘নোটিফিকেশন’ বা বার্তা পাঠালেই প্রথম দেশ তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য থাকবে।

  • তবে ফ্রান্স জানিয়েছে, ‘ডাবলিন অফসেট’ ব্যবস্থার আওতায় বিগত ২০২৪ সালের শরৎ থেকে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মের মধ্যে ফ্রান্সে আসা প্রায় ৩ হাজার ডাবলিন ক্যাটাগরির আবেদনকারীকে তারা প্রথম দেশে ফেরত না পাঠিয়ে নিজেদের দায়িত্বেই রাখছে।

ইউরোড্যাক ডেটাবেজে মুখের বায়োমেট্রিক ও ৬ বছরের শিশুদের তথ্য

১২ জুন থেকে ইউরোড্যাক ডেটাবেজের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে।

  • এখন থেকে ফ্রান্সে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করা সব ব্যক্তির তথ্য রাখা হবে, তারা আশ্রয় আবেদন করুক বা না-করুক।

  • আগে কেবল ১৪ বছরের ঊর্ধ্বের আঙুলের ছাপ নেওয়া হতো।  এখন থেকে ৬ বছর বা তার বেশি বয়সি শিশুসহ সবার আঙুলের ছাপ এবং মুখের বায়োমেট্রিক (Facial Recognition) তথ্য সংগ্রহ ও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা হবে।  ফ্রান্সে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নে এই কড়া নজরদারি নিয়ে ইতিমধ্যে মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সামাজিক সুবিধা ও বস্তুগত গ্রহণ নীতি (CMA)

ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন, খাদ্য, ভাতা (আদা) এবং ৬ মাস পর শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ আগে থেকেই কার্যকর ছিল, যা নতুন ইইউ নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।  তবে পরিবর্তন এসেছে ডাবলিন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।

  • সুবিধা বাতিল: আগে ডাবলিন প্রক্রিয়ার একজন আবেদনকারী তার স্থানান্তর সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সব সামাজিক সুবিধা পেতেন।  এখন অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর নোটিফিকেশন জারি হওয়ার সাথে সাথেই তিনি সমস্ত সরকারি আর্থিক ও আবাসন সুবিধা হারাবেন।

  • ব্যতিক্রম: তবে প্যাক্টের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আশ্রয়প্রার্থীর আচরণগত সমস্যার কারণে তার ন্যূনতম গ্রহণ সুবিধা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা আর যাবে না।  ডাবলিন প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত ব্যক্তি ছাড়া সবার জন্য ন্যূনতম মানবিক সুবিধা চালু রাখতে হবে।