সৌদি আরবে চিকিৎসক ও নার্স পাঠানোর নতুন দুয়ার খুলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে নির্মাণ, সেবা ও বিভিন্ন পেশার কর্মী সৌদি আরবে গেলেও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত।  এবার সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।  প্রথমবারের মতো কাজের ভিসায় বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব, যা দেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা।  তবে দুই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২২ সালে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।  সেই চুক্তির আওতায় ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো প্রায় ৬০ জন বাংলাদেশি চিকিৎসককে নিয়োগ দেয় সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।  এরপর কিছু সময় নিয়োগ কার্যক্রম ধীরগতিতে চললেও সম্প্রতি আবারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত এশা আল-দুহাইলান এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ শুরু করেছে সৌদি আরব।  তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা এখন সৌদি আরবের নির্ধারিত পেশাগত মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন।  ফলে ভবিষ্যতে এই খাতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিয়োগ কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল গত বছর দুই দফা বাংলাদেশ সফর করে।  সফরকালে তারা চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত সক্ষমতা মূল্যায়ন করে।  মূল্যায়নের ফলাফল ইতিবাচক হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে আরও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব প্রাথমিকভাবে ১৫০ জনেরও বেশি প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।  তবে তারা সরকারি হাসপাতাল, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নাকি বেসরকারি খাতে কাজ করবেন, সে বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে।  পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে।

অভিবাসন ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।  বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসক ও নার্স তৈরি করতে পারে, তাহলে এই খাত ভবিষ্যতে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী রপ্তানি শুধু রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধিতেই সহায়ক হবে না, বরং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও শক্তিশালী করবে।  তাঁর মতে, চিকিৎসক ও নার্সদের মতো উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের বিদেশে কর্মসংস্থান দেশের মানবসম্পদের গুণগত মানেরও স্বীকৃতি।

এ ছাড়া সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্সরা সেখানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।  ফলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে প্রবাসী কল্যাণের ক্ষেত্রেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির নতুন এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা এবং পেশাগত সনদ অর্জনের ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।  সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে চিকিৎসক ও নার্স রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক আয়ের একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের এই উদ্যোগ শুধু নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগই নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।