খাবারের দোকানে ১৩ জনের বৈঠক, সেখানেই নিউগিনি হামলার পরিকল্পনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:২২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬
জমি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা করা হয় একটি খাবারের দোকানে। পরে দুই ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ থেকে লোক জোগাড় করে রাতে চালানো হয় সশস্ত্র হামলা। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে সেখানে ১৩ জনকে দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মামলার আসামি শাহরিয়ার মাহমুদ ও ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহ। তদন্তকারীদের ধারণা, ওই বৈঠকেই হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
এরপর বিকাশ চন্দ্র শাহের মাধ্যমে লোক জোগাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলম অনিকের মাধ্যমে ভাষানটেকের মো. ইব্রাহিম ও পল্লবীর মফিজুর রহমান মামুনের সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁদের অনুসারীদের একটি অংশ হামলায় অংশ নেয় বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
হামলার দিন বিকেল চারটার দিকে ভাষানটেকের দেওয়ানপাড়া দোতলা মসজিদের সামনের মাঠ ও মানিকদী এলাকায় লোক জড়ো করা হয়। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সেখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাঁচটি পিকআপে করে এবং হেঁটে প্রায় ২০০ জন নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা শুরু করা হয়।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ওই হামলার সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ওই রাতেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সালমান। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়।
মামলার তদন্ত ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পরিকল্পনায় কারা জড়িত, কারা অংশ নিয়েছে এবং কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে—এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে।
দুই বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণের অভিযোগ
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হামলায় মিরপুর এলাকার মো. ইব্রাহিম ও মফিজুর রহমান মামুনের অনুসারীরা অংশ নেন। ইব্রাহিম ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক। পুলিশের তালিকায় তাঁর নাম ‘কিলার ইব্রাহিম’ হিসেবে রয়েছে। আর মফিজুর রহমান মামুন পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। খুন, জমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গত মঙ্গলবার তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হামলাকারীদের বড় একটি অংশ এসেছিল ভাষানটেক বস্তি থেকে। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দুজনও ওই এলাকার বাসিন্দা এবং তাঁরা ইব্রাহিমের অনুসারী বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ইব্রাহিমের অনুসারী যুবরাজ, শাহেদ, শাকিল, রূপচান, বাবলু ও বুকপোড়া সুমনও হামলায় জড়িত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ভাষানটেক এলাকার বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়াও বলেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলায় ইব্রাহিম ও মামুনের লোকজন জড়িত।
তবে ইব্রাহিম ও মফিজুর রহমান মামুনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিকাশ চন্দ্র শাহও আত্মগোপনে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সাতজন গ্রেপ্তার
হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার মাহমুদ, শাহ আলম, মামুন, আসলাম ও মুন্না। সর্বশেষ গত বুধবার মামলার ৪ নম্বর আসামি গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। পুলিশ জানিয়েছে, সাতজনই রিমান্ডে আছেন।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়ার সাথে জমি নিয়ে গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরোধ ছিল। বিরোধপূর্ণ জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছিলেন ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহ। একই সাথে নিউগিনি প্রকল্পের মালিকের সাথে কথা বলে চলাচলের রাস্তার ব্যবস্থা করার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু নাজিম উদ্দিন রাস্তা দিতে রাজি না হওয়ায় বিরোধ আরও বাড়ে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
পুলিশকে লক্ষ্য করেও গুলি
হামলার একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে ছয়জন পুলিশ সদস্য গেলে তাঁদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয় বলে তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে কারা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
মামলার এজাহারে হামলার সময় আনুমানিক ৫০টি গুলি ছোড়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা পাঁচটি গুলি ছোড়েন।
জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ
তদন্তে নিউগিনি প্রকল্প–সংলগ্ন ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। জমিটির তিন পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি এবং অন্য পাশে নিউগিনি আবাসন প্রকল্প। ওই জমি থেকে বের হওয়ার জন্য নিউগিনি প্রকল্পের রাস্তা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিরোধ ছিল।
নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়ার ভাষ্য, ৩৫ কাঠার মধ্যে ১৫ কাঠা জমি গোলাম মহিউদ্দিন তাঁর কাছে বিক্রি করেছিলেন। ওই জমিতে মাটি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তিনি। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হামলা করে সেটি ভেঙে দেওয়া হয়।
নাজিমের অভিযোগ, জমি বুঝিয়ে না দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন গোলাম মহিউদ্দিন। পাশাপাশি নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের ভেতর দিয়ে রাস্তা চান তিনি। রাস্তা দিতে রাজি না হওয়ায় ভাড়াটে লোক দিয়ে হামলা করানো হয়েছে বলে নাজিমের অভিযোগ।
অবশ্য নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও জমিসংক্রান্ত মামলা রয়েছে। গত জুলাইয়ে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি ক্যান্টনমেন্ট থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগ, জোয়ার সাহারা এলাকায় সাড়ে আট কাঠা জমির পুরো দাম পরিশোধ না করেই তা অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
নাজিম উদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘ট্যাগ’ দিয়ে হয়রানি করেছেন।
এদিকে গত বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের বিবরণ চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।



