অর্থনীতির দুর্বলতায় ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র: বিশ্বব্যাংক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৫:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি সরবরাহ ও বিনিয়োগের দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় দেশে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থেমে গেছে এবং বিশেষ করে নারীরা চাকরি হারিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি।
দরিদ্র পরিবারের অর্ধেকই সুরক্ষার বাইরে
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করলেও সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতিতে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সংস্থাটি। এর মাধ্যমে তথ্যভিত্তিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন মানুষকে কর্মসূচিতে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলেও মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
প্রবৃদ্ধিতে বড় চাপ
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গতি হারিয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ বেড়েছে
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত দূর করা। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা
তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।



