বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতিতে অর্থ ব্যবস্থাপনার ৬ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০২৬
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, আবেদন, স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি), সুপারিশপত্র ও ভিসা-প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিদেশে যাওয়ার পর পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন ফি, বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা, বইপত্রসহ নানা খরচ সামলাতে হয়।
বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পড়তে গেলে এসব ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে শুধু মোট খরচের হিসাব করলেই হয় না; কখন অর্থ পাঠাতে হবে, কোন মাধ্যমে পাঠানো হবে, বিনিময় হারের ওঠানামা কীভাবে বাজেটকে প্রভাবিত করতে পারে এবং জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা কীভাবে থাকবে—এসব বিষয়ও আগে থেকে পরিকল্পনায় রাখা জরুরি।
ভিসার আগেই করুন আর্থিক পরিকল্পনা
ভিসা পাওয়ার পর বা টিউশন ফি পরিশোধের ঠিক আগে অর্থের ব্যবস্থা করতে গেলে সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ শেষ মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার প্রতিকূল হলে একই পরিমাণ অর্থ পাঠাতে বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ভিসা আবেদন ও ফি পরিশোধের সময়সীমার আগেই সম্ভাব্য মোট খরচের একটি পরিকল্পনা করা ভালো। কোন সময়ে কত অর্থ প্রয়োজন হবে, কোন অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো যাবে, সম্ভাব্য বিনিময় হার এবং লেনদেনের সঙ্গে কী ধরনের খরচ যুক্ত হতে পারে—এসব বিষয় আগে থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার উদ্দেশ্যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য নিয়ম, অনুমোদিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কেও আগে থেকে ধারণা নেওয়া জরুরি।
শিক্ষাঋণ নিলেই বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে খরচ কমে না
অনেক ব্যাংক ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান শিক্ষাঋণের পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুবিধা দিয়ে থাকে। এতে প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। তবে একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া ও বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করাই সব সময় সবচেয়ে কম খরচের উপায়—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অর্থ পাঠানোর আগে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, সেবা মাশুল, প্রক্রিয়াকরণ ফি এবং অন্যান্য অতিরিক্ত খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের শর্ত তুলনা করা যেতে পারে।
বড় অঙ্কের অর্থের ক্ষেত্রে বিনিময় হারের সামান্য পার্থক্যও মোট খরচে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু সুবিধাজনক প্রক্রিয়া নয়, পুরো লেনদেনের প্রকৃত খরচ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার খরচ আলাদা করে হিসাব করুন
বিদেশে পড়াশোনার খরচকে মূলত দুটি ভাগে দেখা যায়—টিউশন ফি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়।
টিউশন ফি সাধারণত বড় অঙ্কের এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিশোধ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এ অর্থের ব্যবস্থা আগে থেকেই করা সম্ভব। অন্যদিকে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, মোবাইল ও ইন্টারনেটের মতো খরচ নিয়মিত হয় এবং মাসভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বা অন্যান্য ফি, স্বাস্থ্যবিমা, বই ও শিক্ষাসামগ্রী, ভিসা-সংক্রান্ত খরচ এবং দেশে আসা-যাওয়ার ব্যয়ও বাজেটে রাখা উচিত।
তাই বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু টিউশন ফি বিবেচনা করে বাজেট নির্ধারণ না করে অন্তত কয়েক মাসের সম্ভাব্য জীবনযাত্রার খরচও হিসাব করা ভালো।
সব মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর খরচ এক নয়
বিদেশে অর্থ পাঠানো বা খরচ করার জন্য ব্যাংক লেনদেন, আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য কার্ড, ফরেক্স কার্ড, অনলাইন পেমেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকতে পারে। প্রতিটি ব্যবস্থার বিনিময় হার, লেনদেনের ফি ও অন্যান্য মাশুল আলাদা হতে পারে।
বড় অঙ্কের টিউশন ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কোন ব্যাংকিং বা অনুমোদিত পেমেন্ট পদ্ধতি গ্রহণ করে, তা আগে থেকেই জেনে নেওয়া ভালো। দৈনন্দিন খরচের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য কার্ড সুবিধাজনক হতে পারে।
তবে কার্ড ব্যবহারের আগে বৈদেশিক লেনদেনের ফি, অতিরিক্ত মাশুল ও প্রযোজ্য বিনিময় হার সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। একইভাবে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বেশি পরিমাণ নগদ অর্থ বহন না করাই তুলনামূলক নিরাপদ।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শিক্ষার জন্য অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য নিয়ম ও অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেল অনুসরণ করতে হবে।
আলাদা করে রাখুন জরুরি তহবিল
বিদেশে যাওয়ার পর পরিকল্পনার বাইরে হঠাৎ কোনো খরচ তৈরি হতে পারে। যেমন জরুরি চিকিৎসা, বাসস্থান পরিবর্তন, বৃত্তি বা পরিবার থেকে অর্থ পেতে দেরি হওয়া কিংবা জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফেরার খরচ।
এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য মাসিক বাজেটের বাইরে একটি জরুরি তহবিল রাখা শিক্ষার্থীর আর্থিক চাপ কমাতে পারে। সম্ভব হলে এই অর্থ দৈনন্দিন খরচের অর্থ থেকে আলাদা রাখা উচিত।
জরুরি তহবিলের পরিমাণ দেশ, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ব্যবস্থা ও পারিবারিক আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারে। তবে বিদেশে যাওয়ার আগেই এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা ভালো।
বিদেশে গিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বাজেট করুন
নিজ দেশের মুদ্রায় হিসাব করার অভ্যাস থেকে সরাসরি বিদেশি মুদ্রায় দৈনন্দিন খরচ বোঝা শুরুতে কঠিন হতে পারে। নতুন দেশে গিয়ে কোন খরচ প্রয়োজনীয়, কোনটি কমানো সম্ভব—এসব বুঝতে কিছুটা সময় লাগে।
এর সাথে বিনিময় হারের ওঠানামাও যুক্ত হয়। ফলে বাংলাদেশে বসে করা বাজেট বিদেশে যাওয়ার পর হুবহু কার্যকর নাও হতে পারে।
তাই বিদেশে পৌঁছানোর পর স্থানীয় মুদ্রায় আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং নিয়মিত বাজেট পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাবে কোন খরচ অপরিহার্য, কোনটি কমানো সম্ভব এবং প্রতি মাসে বাস্তবে কত অর্থ প্রয়োজন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা ভিসা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আর্থিক পরিকল্পনাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, অর্থ পাঠানোর খরচ এবং জরুরি তহবিল সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা থাকলে নতুন দেশে গিয়ে অপ্রত্যাশিত আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।



