বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল তাজমিন, সেখানে গিয়ে মিলল মরদেহ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২৬
কুমিল্লায় ধানখেত থেকে জান্নাতুল তাজমিন (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত্যুর আগের রাতে বাবার মোবাইল ফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল সে। সকালে সেই লোকেশন অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের মরদেহ দেখতে পান বাবা আবদুল আলীম।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগৎপুর মাইনিমুড়া এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেছেন তার বাবা। মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার সাথে কারা জড়িত, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
তাজমিন কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সাথে থাকত। সে নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায়।
বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লার বাসা থেকে বের হয় তার মেয়ে। পরে বান্ধবীর সাথে কক্সবাজারে যায়। সেখান থেকে বুধবার (৭ অক্টোবর) কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়।
আবদুল আলীমের ভাষ্য, বুধবার রাতে তিনি মেয়েকে একাধিকবার ফোন করেন। তবে তাজমিন ফোন ধরেনি। রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মুঠোফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলে। তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে বার্তা দেখে লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে যান। গিয়ে মেয়ের মরদেহ দেখতে পান।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
তাজমিনের চলাচলের কিছু দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। ফুটেজ অনুযায়ী, বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজারের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে সে। এরপর হোটেলের পাশের খাবারের দোকান ও কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায়। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সাথে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে।
ফুটেজে রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু দেখানোর পর তাজমিনকে অন্য পাশে যেতে দেখা যায়। রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে ওই এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর সে কোন পথে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো অন্য কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, কারও সাথে দেখা হয়েছিল কি না এবং ঘটনাস্থলের কাছ থেকে উদ্ধার করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশে অটোরিকশা
স্থানীয়দের ভাষ্য, ধানখেতে মরদেহ উদ্ধারের আগে ঘটনাস্থলের কাছে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পান তারা। অটোরিকশা থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে ব্যাগটি পড়ে ছিল। আশপাশের কয়েকটি ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্নও দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে অটোরিকশা ও পরে ব্যাগ দেখতে পান। ধানখেতে এগিয়ে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান তিনি। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
আরেক বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ধানখেতের কয়েকটি স্থানে ধানগাছ এলোমেলো হয়ে ছিল। তাঁর ধারণা, সেখানে ধস্তাধস্তি হয়েছিল। ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
যা বলছে পুলিশ
পুলিশ জানিয়েছে, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পরও তাজমিন পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কুমিল্লায় আসে, পরে কক্সবাজারে যায়। বুধবার কক্সবাজার থেকে বাসে করে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। তবে পুরো যাত্রাপথে তার সাথে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। প্রথমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে এবং কারা জড়িত, তা জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছে। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাজমিনের মৃত্যুর কারণ, ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অটোরিকশাটির ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।



