সমকামী পরিচয়ে আশ্রয় আবেদন তৈরির অভিযোগ, যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার ৩
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০২৬
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি পুরুষদের সমকামী পরিচয়ে উপস্থাপন করে আশ্রয় আবেদনে সহায়তার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন কর্মকর্তারা মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) লন্ডনের বিভিন্ন ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। অপরজনকে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে মোবাইল ফোন, গয়না ও কয়েক হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করা হয়।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা এমন একটি চক্রের সাথে যুক্ত, যারা বাংলাদেশি পুরুষদের জন্য সমকামী পরিচয়ভিত্তিক ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তা করত। অভিযোগ অনুযায়ী, এ কাজে ভুয়া চিঠি, সাজানো ছবি ও অন্যান্য নথি তৈরি করে দেওয়া হতো। এর জন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে ১ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো।
১০০টির বেশি আবেদন পর্যালোচনায়
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কর্মকর্তা ক্রিস ফস্টার জানান, বাংলাদেশি কমিউনিটির এলজিবিটি সংগঠন ‘আপনজন’কে ঘিরে সন্দেহজনক আশ্রয় আবেদনের তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে আবেদনগুলোর ধরন পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা সন্দেহজনক কার্যক্রমের সন্ধান পান।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কের সাথে সংশ্লিষ্ট ১০০টির বেশি আশ্রয় আবেদন বর্তমানে পর্যালোচনা করছে হোম অফিস। এসব আবেদনের কিছু অনুমোদন পেয়ে থাকতে পারে বলেও জানিয়েছেন ফস্টার।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, আবেদনকারীদের পক্ষে ‘আপনজন’-এর নামে ভুয়া সমর্থনপত্র, এলজিবিটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সাজানো ছবি এবং কথিত সমকামী সম্পর্কের প্রমাণ তৈরি করে দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবে সম্পর্ক না থাকলেও নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক থাকার কাহিনি সাজানোর অভিযোগ রয়েছে।
বিবিসির আগের অনুসন্ধানেও একই ধরনের অভিযোগ
বিবিসির আগের এক গোপন অনুসন্ধানে কিছু আইনজীবী ও অভিবাসন পরামর্শকের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে থাকার উদ্দেশ্যে ভুয়া সমকামী পরিচয়ভিত্তিক আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
ওই অনুসন্ধানে একজন পরামর্শক ভুয়া আবেদন তৈরির জন্য ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড দাবি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিনি এলজিবিটি ক্লাবে যাওয়ার ছবি, বিভিন্ন সংগঠনের চিঠি ও কথিত সম্পর্কের প্রমাণ তৈরির প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ।
অন্য একটি আইন প্রতিষ্ঠানের পরামর্শকের বিরুদ্ধে ৭ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে একই ধরনের আবেদন তৈরির প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। তিনি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা কম বলে দাবি করেছিলেন বলেও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আইনজীবী ও পরামর্শক তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাজ্যের আশ্রয়ব্যবস্থায় নিজ দেশে নির্যাতন বা নিপীড়নের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা সুরক্ষার আবেদন করতে পারেন। যৌন অভিমুখিতার কারণে নির্যাতনের আশঙ্কা থাকলেও কেউ আশ্রয় চাইতে পারেন। তবে ভুয়া তথ্য বা জাল নথি দিয়ে আবেদন তৈরির অভিযোগে সাম্প্রতিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেছেন, আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার করে মিথ্যা নির্যাতনের দাবি করা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতারণার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও বলেছেন, নির্যাতনের মিথ্যা দাবি প্রকৃত সুরক্ষাপ্রার্থীদের ক্ষতি করতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতারণা থেকে লাভবান হওয়া চক্রগুলোর বিরুদ্ধে মামলা ও অবৈধ অর্থ জব্দের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, শরণার্থী অধিকারকর্মীরা সতর্ক করেছেন, ভুয়া আবেদন তৈরির অভিযোগের কারণে প্রকৃত এলজিবিটিকিউ+ আশ্রয়প্রার্থীদের যেন অন্যায্যভাবে সন্দেহের মুখে পড়তে না হয়। তাঁদের মতে, প্রতারণার তদন্তের পাশাপাশি প্রকৃত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।



