বাড়ছে নারী শ্রমিকের বিদেশযাত্রা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:৫৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এ সময়ে ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী গেছেন। তাদের ৯০ শতাংশের বেশি গেছেন সৌদি আরব ও জর্দানে।
সৌদি আরব ও জর্দানের পাশাপাশি জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশি নারী শ্রমিক যাচ্ছেন। নতুন ও তুলনামূলক অপ্রচলিত শ্রমবাজারেও তাদের উপস্থিতি বাড়ছে।
নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা বাড়লেও তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান ও চাকরির চুক্তিপত্র ছাড়া বিদেশে যাওয়ার কারণে অনেকে গন্তব্য দেশে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা ও গৃহবন্দি করে রাখার মতো সমস্যায় পড়ছেন।
বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। সংসদে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ জানান, গত আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। তিনি নারী কর্মীদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানান।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, সরকার নারী কর্মীদের নিরাপত্তায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে, যেখানে বিদেশ থেকেও অভিযোগ জানানো যায়। সৌদি আরবে দুটি সেফ হোমসহ কয়েকটি দেশে সেফ হোম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ১০টি দেশে আইনি সহায়তা কার্যক্রম চলছে।
তবে বিদেশফেরত নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতায় পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) পরিচালিত এক গবেষণাতেও বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির কথা বলেছেন। ৯৭ শতাংশ চিকিৎসাসেবা পাননি, ৮০ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার পাননি এবং ৮২ শতাংশকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।
নারী শ্রমিকদের অনেকেই চাকরির লিখিত চুক্তিপত্র ছাড়াই বিদেশে যাওয়ায় বেতন, ছুটি, কাজের সময় বা নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা বিদেশে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠালেও তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, দালালরা উচ্চ বেতন ও ভালো কর্মপরিবেশের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক নারী অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। প্রেম বা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় অনেক নারী গৃহকর্মী বা অনানুষ্ঠানিক কাজে আটকে পড়েন। বিদেশ যাওয়ার আগে ভাষা, পেশাগত দক্ষতা ও গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। তার মতে, দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নারীদের জন্য নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে হবে।
নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা বাড়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ, লিখিত চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তার যাচাই, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং বিদেশে আইনি সহায়তা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।



