সৌদিতে সংঘাতের উত্তাপ, বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:১৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাদেশেও। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হলে এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর। পাশাপাশি রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। দেশটিতে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। একই সঙ্গে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রেমিট্যান্স উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমে যেতে পারে। এতে নতুন শ্রমিক নিয়োগের চাহিদা কমার পাশাপাশি সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয়েও প্রভাব পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনাকালে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে যে ধরনের সংকোচন দেখা গিয়েছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে সৌদি শ্রমবাজারেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণ খাতের বড় প্রকল্পগুলো স্থগিত বা ধীর হয়ে গেলে বিদেশি শ্রমিকদের চাহিদা কমতে পারে।

জ্বালানি আমদানিতেও বাড়ছে উদ্বেগ

সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে। সৌদি আরবও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর একটি।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল অবকাঠামোতে হামলা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তেলের দাম নয়, সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হলে সময় ও খরচ—দুটিই বাড়বে।

চাপে পড়তে পারে সৌদি অর্থনীতিও

সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি হলে দেশটির অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তেলের রাজস্ব কমে গেলে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যেতে পারে।

সৌদি আরবে ব্যবসা করা বাংলাদেশি প্রবাসীরাও সংঘাতের প্রভাব অনুভব করছেন। বিশেষ করে হামলার আশঙ্কা ও মানুষের চলাচল কমে গেলে খুচরা ব্যবসা ও সেবা খাতে আয় কমার ঝুঁকি তৈরি হয়।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলসহ সংঘাতপ্রবণ এলাকার কাছাকাছি বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংঘাত বিস্তৃত হলে প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাংলাদেশিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে একদিকে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে দেশে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও সামনে আসবে।

সৌদি বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশ বর্তমানে সৌদি আরবের বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করছে। বিশেষ করে বন্দর, অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে সৌদি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি সরকারের পাশাপাশি দেশটির বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আগ্রহেও প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে সংঘাতের মাত্রা, স্থায়িত্ব এবং তেল ও সমুদ্রপথের ওপর এর প্রভাব কতটা বাড়ে—তার ওপরই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে।