রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর, জড়িতদের মধ্যে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারাও

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২:১৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সদ্য বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের বাইরে দলটির স্থানীয় কয়েকজন সাবেক নেতা-কর্মীরও সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

পুলিশ জানিয়েছে, হামলার নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। তাঁদের মধ্যে অনেকে সদ্য পদত্যাগ করা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ ওরফে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

এর মধ্যে গত বুধবার রাতে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হলেও রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের তথ্য এবং স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মী।

বহিষ্কৃত ১৪ জনের মধ্যে শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, দারুসসালাম থানার ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব শান্ত রহমান, শাহ আলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের সদস্য হুজাইফা এবং দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব হাফিজুর রহমানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও সফল হয়নি পুলিশ।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, এ ঘটনায় নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

১৫ জন গ্রেপ্তার

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের মধ্যে বিএনপি ও শ্রমিক দলের দুজন নেতাও রয়েছেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম খোকন এবং শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি মো. আলম রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনার সময় তাঁদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সময় যে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানার ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই সমিতির চার সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সমিতির সম্পাদক শাহ আলম ও অফিস সহকারী শাহাদাত রয়েছেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিতে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর বহনকারী লোবেড গাড়ির চালক শহীদুল ইসলামকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভাঙচুরে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরটি হেমায়েতপুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ ঘটনায় কয়েকজন তরুণকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে টাকার বিনিময়ে ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

নেপথ্যের ব্যক্তিদের খোঁজ

২৫ সেপ্টেম্বর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়। মামলায় বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হামলার আগে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং মামলার আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে তাঁরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যান।

সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন লেলিনের কার্যালয়ের সামনে লোকজনকে জড়ো হতে দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশের বিভিন্ন মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজে একটি সাদা মাইক্রোবাসের চলাচলের তথ্যও পাওয়া গেছে।

সূত্রের দাবি, হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছে একটি স্থান থেকে লাঠিসোঁটা, রামদা ও হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করেন। পরে মাথায় কাপড় ও মুখোশ ব্যবহার করে তাঁরা হামলায় অংশ নেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, হামলার সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম, ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল এবং দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিলেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে। যারাই জড়িত থাকুক, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধী হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো