দক্ষ কর্মী তৈরিতে বড় ঘাটতি, শ্রমবাজারে পিছিয়ে বাংলাদেশ

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:২৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬

বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন দেশে গেলেও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এখনো পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৭১ শতাংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। তাঁদের ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশই আধা-দক্ষ বা অদক্ষ কর্মী। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের বড় অংশ কম মজুরির কাজে আটকে থাকছে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (RMMRU) ‘বাংলাদেশ হতে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৫: অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ ছিলেন পেশাজীবী এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী। অর্থাৎ বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশই দক্ষতার দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো (TTC) থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া কর্মীদের সঙ্গেও বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার যথেষ্ট সমন্বয় নেই। ILO, WARBE Development Foundation ও CPD-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে ৯২ শতাংশ, রাজশাহী ও রংপুরে ৮৪ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮৩ শতাংশ বিদেশগামী কর্মীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না।

প্রশিক্ষণ নিয়েও বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কম। TTC-তে প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৭৯ শতাংশ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু তাঁদের মাত্র ৩৮ শতাংশ বিদেশে চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। এতে বোঝা যায়, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার একটি বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে।

প্রশিক্ষণকেন্দ্রে জনবল সংকট

দেশের ৪০টি TTC-তে অনুমোদিত পদের সংখ্যাও পূর্ণাঙ্গ নয়। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৭৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রায় ৩৬টি পদই শূন্য। প্রশিক্ষকের পদও গড়ে ২১টি করে খালি রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন প্রশিক্ষকের বিপরীতে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। ফলে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে বাংলাদেশের কর্মীরা বিশ্বের প্রায় ১৭৫টি দেশে গেলেও মোট বিদেশগামী কর্মীর ৯৪ শতাংশই যাচ্ছে সাতটি প্রধান শ্রমবাজারে। ফলে নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। শ্রমবাজারে টেকসই অবস্থান তৈরি করতে নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারগুলোতে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদা বেশি

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভাষাজ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের গুরুত্ব বাড়ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ভাষা ও দক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ইউরোপের বিভিন্ন উদ্যোগেও দক্ষতা উন্নয়ন ও সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিদেশগামী অনেক কর্মীর মধ্যে বিদেশি ভাষা শেখার আগ্রহও তুলনামূলক কম। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া অনেক কর্মী দেশটিতে পৌঁছানোর পর ভাষা শেখার চেষ্টা করেন। এতে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কতসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেন, তা দিয়ে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের সাফল্য পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। তাঁদের দক্ষতা, কর্মসংস্থানের ধরন, আয় এবং কর্মপরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ প্রশিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের সনদ এবং বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংখ্যার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শ্রম অভিবাসন নিশ্চিত করা। নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং উচ্চ মজুরির কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি রপ্তানি ব্যবস্থা এবং বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে হবে।