আধুনিক জীবনযাত্রায় মুমিনের ভাবনা
মাওলানা হানিফ আশরাফি
প্রকাশিত: ৬:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬
বর্তমানের মানুষ অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখ-সমৃদ্ধি ভোগ করছে। এমন অনেক সুযোগ-সুবিধা আজ আমাদের হাতের নাগালে, যা অতীতের মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি। এসব নিয়ামতের কারণে আমাদের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি আমাদের আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করেছে, নাকি তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে? আমরা কি এসব নিয়ামত আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করছি, নাকি তাঁর অবাধ্যতায়?
বিষয়টি বোঝার জন্য অতীতের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে বর্তমানের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। জীবনের কয়েকটি অপরিহার্য বিষয়—পানি, খাদ্য, পোশাক, যাতায়াত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি দেখা যাক।
১. পানি : জীবনধারণের অপরিহার্য নিয়ামত
পানি আল্লাহ তাআলার অন্যতম বড় নিয়ামত। তিনি পানিকে জীবনের মূল উপাদান বানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, ‘আর আমি পানি থেকে প্রতিটি প্রাণবান বস্তুকে সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ঈমান আনবে না?’ (সুরা : আল-আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)
অতীতে মানুষ কূপ ও ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করে পান করত। দুধ ও দইয়ের মতো পানীয়ও ছিল সীমিত। কিন্তু আজ আল্লাহর অনুগ্রহে প্রায় সর্বত্র ও সব সময় পানি সহজলভ্য।
অথচ গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এমনকি অজুর ক্ষেত্রেও পানির ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। আল্লাহর দেওয়া এই নিয়ামতের অপচয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
২. খাদ্য : প্রাচুর্যের সঙ্গে কমছে কৃতজ্ঞতা
অতীতের মানুষ নিজেদের উৎপাদিত ফসল ও গবাদি পশু থেকে পাওয়া খাদ্যের ওপর নির্ভর করত। ঘরেই খাবার তৈরি করত এবং অল্পতেই তৃপ্ত থাকত। তাদের খাবারে ছিল বরকত, সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তি।
অন্যদিকে, আজ আমাদের বড় একটি অংশের খাবার আসে ঘরের বাইরে থেকে। তৈরি খাবারের প্রচলন বেড়েছে। অনেক খাবারে কৃত্রিম উপাদানের ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে পেট ভরলেও নানা রোগব্যাধি বাড়ছে।
এর সঙ্গে বেড়েছে অপচয় ও অপব্যয়। অথচ কমছে কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর প্রশংসা। খাদ্যের প্রাচুর্য আমাদের কৃতজ্ঞতা বাড়ানোর পরিবর্তে যেন অসচেতনতা ও অপচয়ের কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
৩. পোশাক : আবরণের নিয়ামত থেকে অহংকারের উপকরণ
অতীতের মানুষ শরীর ঢাকার প্রয়োজনেই পোশাক পরত। অতিরিক্ত আড়ম্বর ও অপচয়ের সুযোগ ছিল কম। পোশাক হাতে তৈরি করা হতো এবং বছরের পর বছর ব্যবহার করা হতো।
কিন্তু আজ অনেকের পোশাক রাখার জায়গাই সংকুলান হয় না। আলাদা আলমারিও যেন যথেষ্ট নয়। ফ্যাশন ও বাহারি পোশাকের মাধ্যমে আভিজাত্য প্রদর্শন, প্রতিযোগিতা ও অপচয়ের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে।
কখনো কখনো পোশাক শালীনতা ও আবরণের পরিবর্তে ফিতনা ও প্রলোভনের মাধ্যম হয়ে উঠছে। তাই পোশাকের এই নিয়ামত ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করা থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
৪. যাতায়াত : সহজ সফর, তবু অভিযোগের শেষ নেই
অতীতে মানুষ দীর্ঘ পথ হেঁটে অতিক্রম করত। সুযোগ পেলে বাহন হিসেবে পশু ও উট ব্যবহার করত। যাতায়াতে তাদের অসহনীয় কষ্ট ও দুর্ভোগ সহ্য করতে হতো।
অথচ আজ আমাদের সামনে রয়েছে আরামদায়ক ও দ্রুতগতির অসংখ্য যানবাহন—গাড়ি, বিমান, ট্রেনসহ আরও কত কিছু!
তার পরও দেখা যায়, সফর কিংবা যাত্রায় মাত্র কয়েক মিনিট দেরি হলেই কেউ কেউ ব্যাপক অভিযোগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অথচ আল্লাহ তাআলার বাণী কতই না সত্য—‘আর আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১৩)
৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম : দূরত্ব ঘুচেছে, সম্পর্ক কি সুন্দর হয়েছে?
অতীতের মানুষ যোগাযোগের জন্য লিখিত চিঠির ওপর নির্ভর করত। একটি চিঠি গন্তব্যে পৌঁছতে কয়েক মাস লেগে যেত; অনেক সময় তা পৌঁছাতও না। কেউ সফরে বের হলে কখনো কখনো বছরের পর বছর তার কোনো সংবাদ পাওয়া যেত না।
আজ যোগাযোগ অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকা মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলা যায়, এমনকি সরাসরি দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যোগাযোগ সহজ হওয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কগুলোও কি সুন্দর হয়েছে?
প্রযুক্তিগতভাবে দূরত্ব কমলেও অনেক ক্ষেত্রে মানুষ যেন দিন দিন আরও অসামাজিক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
৬. নিয়ামত যেন অবাধ্যতার কারণ না হয়
আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত কখনো ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতার কারণ হওয়া উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে গিবত, চোগলখুরি, গুজব ও মিথ্যা প্রচারের মাধ্যম বানানো যাবে না।
যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধাকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কিংবা নিজের জীবন ধ্বংসের কারণ করা যাবে না। খাদ্যের প্রাচুর্যকে রোগব্যাধি ও অলসতার কারণ হতে দেওয়া যাবে না। পোশাকের প্রাচুর্যকে অহংকার, লোকদেখানো ও পাপাচারের উপকরণ বানানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
সর্বদা মনে রাখতে হবে, আল্লাহর দেওয়া এসব নিয়ামত সম্পর্কে একদিন আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদের নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা : আত-তাকাসুর, আয়াত : ৮)
তাই আধুনিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা আমাদের জন্য আল্লাহর নিয়ামত। এসব নিয়ামত আমাদের আল্লাহর আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা ও ভালো কাজে আরও বেশি উৎসাহিত করবে—এটাই হওয়া উচিত একজন মুমিনের ভাবনা।



