কানাডার অভিবাসননীতি : বন্ধ দরজা কি আবার খুলছে ?
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬
কানাডা কি আবার অভিবাসনের দিকে ফিরছে? প্রশ্নটি এখন আর নিছক কৌতূহলের নয়। বরং দেশটির অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও জনমিতিক বাস্তবতা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অভিবাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি আবারও অভিবাসীদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে সরকারকে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই পরিবর্তনের আভাসই পাওয়া যাচ্ছে।
আগামী ১ নভেম্বর কানাডা ২০২৭-২০২৯ মেয়াদের নতুন ‘ইমিগ্রেশন লেভেলস প্ল্যান’ প্রকাশ করবে। এই পরিকল্পনা শুধু কানাডার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের লাখো মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন পরিকল্পনায় কানাডা কতজন স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসী নেবে, কোন ধরনের জনশক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে এবং আগামী কয়েক বছরে অভিবাসনের গতিপথ কোন দিকে যাবে—তার একটি ধারণা পাওয়া যাবে।
গত কয়েক বছরে কানাডা অভিবাসনের লাগাম টেনে ধরেছে। এর কারণও অমূলক নয়। দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে মানুষের অসন্তোষও বেড়েছিল। ফলে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা কমানো এবং স্থায়ী অভিবাসনের হার নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।
কিন্তু অভিবাসন কমানোরও মূল্য আছে। কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে। একদিকে দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতির আশঙ্কা বাড়ছে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি, দক্ষ কর্মী ও নতুন উদ্যোক্তার চাহিদা পূরণে অভিবাসন যে গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তবতা আবারও সেটি মনে করিয়ে দিচ্ছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই কানাডার সামনে সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত অভিবাসন নয়, প্রয়োজনভিত্তিক অভিবাসন—সম্ভবত ভবিষ্যৎ কানাডীয় নীতির মূল দর্শন হতে পারে।
এখানেই বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনার জায়গাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাজ করার সক্ষমতা রাখেন। চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি পেশা, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি, ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন খাতে দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তি ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।
কানাডা যদি আগামী বছরগুলোতে আবারও শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী অভিবাসন বাড়ায়, তাহলে এই দক্ষ জনশক্তির সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সুযোগটি সবার জন্য সমান হবে না। কানাডা এমন অভিবাসীই চাইবে, যারা দেশটির অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারবেন।
তাই কানাডায় যাওয়ার স্বপ্নকে শুধু ভিসার স্বপ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখতে হবে।
যে তরুণ আজ কানাডায় অভিবাসনের কথা ভাবছেন, তাঁর প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজের যোগ্যতা বাড়ানো। ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদ—এসবই ভবিষ্যৎ অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে কোন প্রদেশে কোন পেশার চাহিদা বেশি, কোন খাতে কর্মীর সংকট রয়েছে এবং কোন অভিবাসন কর্মসূচি নিজের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব বিষয়ও জানতে হবে।
এখানে বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। অনেকেই অভিবাসনকে যোগ্যতা অর্জনের ফল হিসেবে না দেখে দালালের মাধ্যমে দ্রুত বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেন। ফলে ভুয়া চাকরির অফার, জাল কাগজপত্র, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রতারণার শিকার হন অনেকে। কানাডার সম্ভাব্য অভিবাসননীতি কিছুটা উদার হলে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি।
কানাডার দরজা খুললে সেখানে প্রবেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ‘চাবি’ হবে দক্ষতা—দালাল নয়।
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখতে হবে। কানাডা অভিবাসন বাড়ালেই আবেদনের প্রক্রিয়া সহজ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ভুল। বরং প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দক্ষ কর্মীরা একই সুযোগের জন্য আবেদন করবেন। ফলে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই হবে না; ভাষা, কর্ম-অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা এবং কানাডার শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে নিজের যোগ্যতার সামঞ্জস্য তৈরি করতে হবে।
কানাডার জন্যও বিষয়টি সহজ নয়। দেশটির সরকারকে একদিকে নাগরিকদের আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় মানুষও আনতে হবে। অস্থায়ী ও স্থায়ী অভিবাসীদের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে নতুন অভিবাসীদের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
সুতরাং আগামী ১ নভেম্বরের পরিকল্পনাটি শুধু কতজন অভিবাসী নেওয়া হবে, সেই সংখ্যার হিসাব নয়; বরং কানাডা ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও সমাজকে কীভাবে সাজাতে চায়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হতে পারে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও এ সুযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কানাডার সম্ভাব্য শ্রমবাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা ও পেশাগত সনদ অর্জনে তরুণদের উৎসাহিত করতে হবে। বৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারি পর্যায়ে তথ্যপ্রচারও বাড়াতে হবে।
কারণ বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে তা শুধু একজন ব্যক্তির ভাগ্য বদলাবে না, দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখবে। বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়লে রেমিট্যান্স বাড়বে, পরিবারগুলোর আয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কানাডা হয়তো তার অভিবাসনের দরজা পুরোপুরি খুলবে না। বরং সম্ভাবনা বেশি—দরজাটি খুলবে বেছে বেছে, প্রয়োজন অনুযায়ী এবং দক্ষতার ভিত্তিতে। আর সেই দরজার সামনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকবে তারাই, যারা আগে থেকেই প্রস্তুত।
তাই আগামী ১ নভেম্বরের অপেক্ষা শুধু কানাডার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও একটি বার্তা। বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে ভিসার আবেদন দিয়ে নয়, নিজের যোগ্যতা তৈরির মাধ্যমে।
কানাডা যদি নতুন করে অভিবাসনের সুযোগ বাড়ায়, তাহলে সুযোগটি তারাই নেবেন, যারা সুযোগ আসার আগেই প্রস্তুত হয়েছেন। এখন প্রশ্ন কানাডা কতজনকে নেবে—শুধু তা নয়; প্রশ্ন হলো, সেই সুযোগের জন্য বাংলাদেশ থেকে আমরা কতজনকে সত্যিকার অর্থে প্রস্তুত করতে পেরেছি।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা


