কানাডার ভিসা জালিয়াতি: দায় কয়েকজনের, ঝুঁকিতে হাজারো আবেদনকারী
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ২:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
বিদেশে পড়াশোনা, কর্মসংস্থান কিংবা উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি কানাডায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের এই স্বপ্নকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির অসাধু দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী। ভুয়া আমন্ত্রণপত্র, জাল নথি এবং মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা শুধু আবেদনকারীদের অর্থই হাতিয়ে নেয় না, তাঁদের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। কানাডায় ২০৯ বাংলাদেশিকে ঘিরে ভিসা জালিয়াতির যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা এই বিপদেরই গুরুতর উদাহরণ।
কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিককে কানাডায় আনার উদ্দেশ্যে ২৪৩টি অস্থায়ী ভিসার আবেদনে মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া নথিপত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন আদালতে হাজির হয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পঞ্চম অভিযুক্ত বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতে নির্ধারিত হবে। তবে অভিযোগের ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের অপরাধের অভিযোগ হিসেবে দেখেই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। কারণ, ভিসা জালিয়াতির প্রভাব অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো দেশের ভিসা আবেদনে জাল নথি ও মিথ্যা তথ্যের ব্যবহার বাড়লে সেই দেশের আবেদনকারীদের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রকৃত শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী, পর্যটক কিংবা বৈধ আমন্ত্রণে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের আবেদনও বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে পারে। ভিসা প্রক্রিয়া আরও জটিল হওয়া, সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ সময় লাগা কিংবা প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক আবেদনকারী ভিসা পাওয়ার আশায় দালাল বা তথাকথিত পরামর্শকের হাতে পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত তথ্য ও বিপুল অর্থ তুলে দেন। কেউ কেউ জানেন না, তাঁদের আবেদনে কী তথ্য দেওয়া হচ্ছে কিংবা কোন নথি জমা পড়ছে। আবার দ্রুত ভিসা, নিশ্চিত অনুমোদন বা বিশেষ যোগাযোগের মাধ্যমে আবেদন সফল করার প্রতিশ্রুতিতে প্রলুব্ধ হয়ে কেউ কেউ জেনেশুনেও ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান। উভয় ক্ষেত্রেই পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। আবেদন প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ভিসা আবেদনে জটিলতা, আর্থিক ক্ষতি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে প্রবেশ-অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব আবেদনকারীর নিজের। কোনো প্রতিনিধি বা পরামর্শকের সহায়তা নিলেও আবেদনে কী তথ্য দেওয়া হচ্ছে, কোন নথি জমা পড়ছে এবং সেগুলোর সত্যতা কী—তা যাচাই করতে হবে। ভুয়া আমন্ত্রণপত্র, জাল ব্যাংক নথি, মিথ্যা চাকরির প্রস্তাব কিংবা সাজানো শিক্ষাগত তথ্য দিয়ে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা কখনোই নিরাপদ পথ নয়। কোনো দালাল ভিসা নিশ্চিত করার দাবি করলে কিংবা প্রকৃত তথ্য গোপন রাখতে বললে সতর্ক হতে হবে। আবেদনকারীর উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি অভিবাসন ওয়েবসাইট থেকে নিয়ম যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদিত প্রতিনিধির সহায়তা নেওয়া।
একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কেউ যদি অজান্তে কোনো দালালের মাধ্যমে জাল নথি জমা দিয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি গোপন না করে যথাযথ আইনি পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে জালিয়াতিতে জড়িত থাকার প্রমাণ থাকলে কেবল দালালের ওপর দায় চাপিয়ে আবেদনকারী নিজেকে সব ধরনের দায় থেকে মুক্ত ভাবতে পারেন না। প্রতিটি আবেদনে তথ্যের সত্যতা ও নথির বৈধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা অভিবাসনের নামে প্রতারণা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে। অনুমোদনহীন এজেন্টদের পরিচয় ও কার্যক্রম যাচাই, প্রতারণার অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কানাডার ভিসা প্রক্রিয়া, আবেদনকারীর দায়িত্ব, অনুমোদিত প্রতিনিধির ভূমিকা এবং জাল নথি ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।
জনশক্তি, শিক্ষা ও অভিবাসনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি। বিদেশে পড়তে বা কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য সহজবোধ্য তথ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে দালালনির্ভরতা কমবে। আবেদনকারীরা কোথায় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন, কোনো এজেন্টের বৈধতা কীভাবে যাচাই করবেন এবং প্রতারণার শিকার হলে কোথায় অভিযোগ জানাবেন—এসব তথ্য সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
কানাডার কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকেও নিশ্চিত করতে হবে, কয়েকজন ব্যক্তি বা চক্রের অনিয়ম যেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বৈধ সুযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অভিযোগের দায় ব্যক্তির, কিন্তু তার নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে। এ কারণেই ভিসা জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী, কর্মী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভবিষ্যৎ রক্ষারও প্রশ্ন।
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের কোনো শর্টকাট নেই। সঠিক তথ্য, বৈধ কাগজপত্র এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়াই নিরাপদ অভিবাসনের ভিত্তি। ভুয়া নথির মাধ্যমে সাময়িক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির ভবিষ্যৎ এবং দেশের সুনাম—দুটোকেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, আবেদনকারীদের সচেতনতা এবং সরকারি পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসেবা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা


