তাজমিন হত্যাকাণ্ড: পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২৬
কুমিল্লার লালমাইয়ে ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার এবং ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা আমাদের সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বাবার মুঠোফোনে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েও শেষ পর্যন্ত জীবন রক্ষা করতে পারেনি তাজমিন। তার মর্মান্তিক পরিণতি একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি, একই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
সন্তানের নিরাপত্তায় পরিবারের সচেতনতা জরুরি। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাতায়াত করছে এবং কখন বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খোঁজ রাখা প্রয়োজন। সন্তানদের সাথে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো বিপদ বা অস্বস্তির মুখে তারা নির্দ্বিধায় পরিবারের সহায়তা চাইতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, কোথায় সাহায্য চাইতে হবে, তা-ও শেখানো দরকার। তবে পরিবারের সচেতনতার কথা বলতে গিয়ে কোনোভাবেই ভুক্তভোগী কিংবা তার স্বজনদের দায়ী করা যাবে না। অপরাধের দায় অপরাধীরই।
নিরাপদ সমাজ গড়তে নাগরিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। পথে বা গণপরিবহনে কেউ বিপদে পড়লে তা উপেক্ষা না করে নিরাপদ উপায়ে সহায়তা করা, প্রয়োজন হলে জরুরি সেবায় খবর দেওয়া এবং অপরাধের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত। সন্দেহজনক পরিস্থিতি দেখেও নীরব থাকা কিংবা সামাজিক দায় এড়িয়ে যাওয়া অপরাধ প্রতিরোধের পথকে কঠিন করে তোলে। একই সাথে গণপরিবহন ও ভাড়ায় চালিত যানবাহনের নিরাপত্তা, চালকদের পরিচয় যাচাই এবং যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে পরিবার ও সমাজের সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে হবে, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধের আলামত যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে হবে। তাজমিন হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে এ ধরনের অপরাধ যেন বারবার ঘটতে না পারে, সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কোনো হত্যাকাণ্ডে আসামি গ্রেপ্তার হলেই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সময়মতো অভিযোগপত্র দাখিল, সাক্ষী ও আলামতের সুরক্ষা এবং আদালতে স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব, পরিচয় কিংবা অর্থ যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। একই সাথে শুধু আলোচিত হত্যাকাণ্ড নয়, প্রতিটি হত্যার তদন্ত ও বিচার যেন সমান গুরুত্ব পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে তোলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়। তাই অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি। ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ বিচার এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এই নীতির কোনো বিকল্প নেই।
তাজমিন আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে না যায়। পরিবারকে হতে হবে সচেতন, সমাজকে নিতে হবে দায়িত্ব, আর রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার। তাজমিন হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। কোনো হত্যাই যেন বিচারহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা



