যুদ্ধের অভিঘাতে প্রবাসী শ্রমিক, ঝুঁকিতে রেমিট্যান্স

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:৫৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকায়। কেউ চাকরি হারাচ্ছেন, কেউ কর্মহীন অবস্থায় বিদেশে দিন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে দেশে ফিরছেন। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিপাকে পড়বেন প্রবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার, চাপে পড়বে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও। অথচ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই প্রবাসী আয়। তাই পরিস্থিতিকে কেবল সাময়িক সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মূল্য দিতে হবে শ্রমিক, তাঁদের পরিবার ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে।

প্রবাসী শ্রমিকেরা ঋণ করে, জমিজমা বিক্রি করে কিংবা পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে বিদেশে যান। তাঁদের অনেকের কাঁধে থাকে ঋণের বোঝা, পেছনে থাকে স্বজনদের ভরণপোষণের দায়িত্ব। চাকরি হারালে তাঁদের আয় বন্ধ হয়, কিন্তু দায়দেনা বন্ধ হয় না। দেশে ফিরে কর্মসংস্থান না পেলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসনকে কেবল সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি তাঁদের জীবন-জীবিকা রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

সরকার ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের কথা বলছে। উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয়, কিন্তু ঘোষণায় সংকট কাটবে না। প্রথমেই কতজন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, কতজন কর্মহীন এবং কতজন দেশে ফিরেছেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব করতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত বিপদগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য দূতাবাসের মাধ্যমে জরুরি সহায়তা ও আইনি পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ফেরা শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। এসব উদ্যোগের অগ্রগতি দৃশ্যমান হতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা কেবল আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না থাকেন।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেও আঞ্চলিক সংঘাতের সময় বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এখন আর বিকল্প কোনো উদ্যোগ নয়, বরং সময়ের দাবি। ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে হবে। একইসাথে কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানের সনদ অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই; তাঁদের দক্ষতা, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালের প্রতারণা ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম শ্রমিকদের এমনিতেই দুর্বল করে রাখে। সংকটের সময়ে এই দুর্বলতার মূল্য আরও বেশি দিতে হয় তাঁদের। তাই অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগেই শ্রমিকদের চাকরির চুক্তি, বেতন, কর্মঘণ্টা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত না রেখে জনশক্তি রপ্তানির সাফল্য দাবি করা অর্থহীন।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এর অভিঘাত পড়তে পারে উৎপাদন, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। তাই বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। একইসাথে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি মূল্যায়ন করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজানো জরুরি।

এই সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের তালিকা তৈরি, জরুরি সহায়তা, দেশে ফেরা কর্মীদের পুনর্বাসন, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। কে কোন দায়িত্ব পালন করবে, কত সময়ের মধ্যে করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কখন থামবে, তা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু এর অভিঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া অবশ্যই বাংলাদেশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রবাসী শ্রমিকেরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস নন; তাঁরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। সংকটের সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজে অগ্রাধিকার, সাময়িক উদ্যোগের বদলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যার বদলে তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে রেমিট্যান্স রক্ষার উদ্যোগও টেকসই হবে না।

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা