যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমছে, নাকি কৌশল বদলাচ্ছে?

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক মোড়ে পৌঁছেছে।  একদিকে সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে আলোচনার দরজাও খোলা রাখছে।  ফলে প্রশ্ন উঠেছে—উত্তেজনা কি সত্যিই কমছে, নাকি উভয় পক্ষ নতুন কৌশল গ্রহণ করছে?

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেছেন, তারা একটি দমনমূলক শাসনের অধীনে বসবাস করছে এবং নিজেদের মত প্রকাশ বা প্রতিবাদের সুযোগ পাচ্ছে না।

ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস অনুষ্ঠানে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের জনগণ ভীত। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু অন্য পক্ষের হাতে অস্ত্র আছে।  তারা প্রতিবাদ করতে গেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।”

সামরিক চাপের পাশাপাশি আলোচনার বার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক অবস্থান দ্বিমুখী কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।  একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে চাপ অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের কথাও জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার পথে অগ্রগতি হয়েছে এবং সেই কারণেই তিনি পরিকল্পিত নতুন সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন।

তিনি বলেন, “চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ও স্থান খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।”

এ বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।  শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি এবং জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

তবে ইরান সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।  ফলে দুই দেশের বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা অসামঞ্জস্য এখনো রয়ে গেছে।

জনগণ ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য টানছেন ট্রাম্প

সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের সরকার এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানার চেষ্টা করেছেন।

তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের জনগণ নয়, বরং দেশটির শাসকগোষ্ঠী ও তাদের নীতিমালা।  এ কারণেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাতে অনাগ্রহী বলে উল্লেখ করেছেন।

ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি চাইলে এক মিনিটের মধ্যেই তা করতে পারি।  কিন্তু আমি তা করতে চাই না, কারণ এতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প একদিকে ইরানি জনগণের প্রতি সহানুভূতির বার্তা দিতে চাইছেন, অন্যদিকে তেহরানের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছেন।

আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে পুরোনো দ্বন্দ্ব

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে।  ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছে।

ইরান দাবি করে, এসব পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার অংশ।  অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তেহরান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।  ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলেছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের নতুন দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করেছে।

তার মতে, এ অভিযানের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে এবং তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, এক পর্যায়ে ২২টি তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করা হয়েছিল এবং প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনে সহায়তা দেওয়া হয়।

তবে এসব দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।  মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

উত্তেজনা কমছে, নাকি নতুন কৌশল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘উত্তেজনা কমে যাওয়া’ বলা কঠিন।  কারণ একদিকে সামরিক উপস্থিতি, নৌ অবরোধ এবং কৌশলগত চাপ বহাল রয়েছে; অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্ভাব্য সমঝোতার পথও খোলা রাখা হয়েছে।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ এবং ‘সীমিত কূটনীতি’—এই দুই কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করছে।  অন্যদিকে ইরানও সামরিক সক্ষমতার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি শান্তির পথে এগোচ্ছে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।  তবে উভয় পক্ষের বক্তব্যে সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।