উন্নত জীবনের স্বপ্নে মৃত্যু সাগর পাড়ি, ক্যানারি রুটে নতুন ট্র্যাজেডি

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ৭:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী বিপজ্জনক আটলান্টিক অভিবাসন রুটে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই অন্তত ১ হাজার ৩১৭ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে।  স্পেনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন কামিনান্দো ফ্রন্তেরাস প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, মৃতদের মধ্যে ১৪২ জন নারী এবং ১২৯ জন শিশু রয়েছে।  এছাড়া ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করা অন্তত ২৭টি নৌকার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।  ফলে ওই নৌকাগুলোর আরোহীদেরও নিহত বা নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও উদ্বেগ কাটেনি

কামিনান্দো ফ্রন্তেরাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ক্যানারি রুটে স্পেনে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ৩ হাজার ৯০ জন অভিবাসীর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।  আর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায় বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

তবে চলতি বছরে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এর পেছনে আরও জটিল বাস্তবতা রয়েছে।

তাদের মতে, মৃত্যুর সংখ্যা কমার অর্থ এই নয় যে অভিবাসন ঝুঁকি কমেছে।  বরং কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এখন আরও দীর্ঘ ও বিপজ্জনক রুট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরকারি তথ্যের চেয়ে বেশি এনজিওর হিসাব

কামিনান্দো ফ্রন্তেরাসের প্রকাশিত সংখ্যা স্পেনের সরকারি হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা নিহতদের পরিবার, বেঁচে ফেরা যাত্রী এবং স্থানীয় সূত্রের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করে।  ফলে তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত মৃত্যুর পাশাপাশি সম্ভাব্য নিখোঁজ ও মৃতদের সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

সংস্থাটির দাবি, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশিত হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।  কারণ অনেক ছোট নৌকা সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে যায় বা ডুবে যায়, যেগুলো কখনোই রাডার বা উদ্ধার সংস্থার নজরে আসে না।

কমেছে অভিবাসী আগমন, বেড়েছে সমুদ্র নজরদারি

গত এক দশকে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।  ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হওয়ায় এই দ্বীপপুঞ্জ আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় ক্যানারি রুটে অভিবাসী আগমন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মৌরিতানিয়া, মরক্কো এবং অন্যান্য পশ্চিম আফ্রিকান দেশের সঙ্গে স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রে নজরদারি ও নৌকা আটকানোর ঘটনা বেড়েছে।  এর ফলেই অভিবাসীদের একটি বড় অংশ ইউরোপের পথে যাত্রা করতে পারছে না।

আরও দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথে যাত্রা

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার কারণে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী এখন আফ্রিকার আরও দক্ষিণাঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করছেন।

বিশেষ করে গিনি থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি।  দীর্ঘ এই সমুদ্রপথে খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আটলান্টিক মহাসাগরের এই রুট বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসনপথে পরিণত হয়েছে।

‘নিয়ন্ত্রণ নীতিরও দায় রয়েছে’

মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কামিনান্দো ফ্রন্তেরাস সতর্ক করেছে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণভিত্তিক নীতির কারণে উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সংস্থাটির ভাষ্য, “স্পেনমুখী অভিবাসন রুটে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এমন নিয়ন্ত্রণনীতি, যা অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”

তারা আরও উল্লেখ করেছে, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর চেষ্টা করা অভিবাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশ্চিম আফ্রিকার অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনাথ শিশু রয়েছে।  ফলে নিহতদের বড় অংশই খুব অল্পবয়সী।

অভিবাসন ইস্যুতে পোপের বার্তা

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে পোপ লিও চতুর্দশের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ সফরের পরপরই।

অভিবাসী ও শরণার্থীদের দুর্ভোগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরতেই তিনি এই সফর করেন।  পোপ অভিবাসন সংকটকে এমন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তার পূর্বসূরি পোপ ফ্রান্সিসের মতো তিনিও অভিবাসনকে মানবিক ও নৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছেন।

স্পেনে নিয়মিতকরণ কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক

স্পেনে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে অভিবাসন প্রশ্নটি আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকার ইতোমধ্যে পাঁচ লাখের বেশি অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধ মর্যাদা দেওয়ার একটি বৃহৎ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে।

এই কর্মসূচির আওতায় বৈধতা পাওয়া ব্যক্তিরা চাকরির বাজার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অধিক সুযোগ পাবেন।

তবে বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে ডানপন্থি ভোক্স পার্টি, এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করছে।  তাদের দাবি, এমন পদক্ষেপ আরও বেশি অনিয়মিত অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে পারে।

মানবিক সংকট এখনো অব্যাহত

অভিবাসী আগমন কমেছে, সীমান্ত নজরদারি বেড়েছে, নতুন নতুন নীতি কার্যকর হয়েছে—তবুও ক্যানারি রুটে মৃত্যুর মিছিল থামছে না।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মূল কারণগুলো সমাধান না হলে উন্নত জীবনের আশায় মানুষ জীবন বাজি রেখে সমুদ্রপথে যাত্রা করতেই থাকবে।

আর সেই বাস্তবতায় ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী আটলান্টিক রুট এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন করিডরগুলোর একটি হিসেবেই রয়ে গেছে।