ইউরোপে অভিবাসন নীতিতে ঐতিহাসিক কড়াকড়ি
কার্যকর হলো নতুন ‘অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬
অবৈধ বা অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘অ্যাসাইলাম অ্যান্ড মাইগ্রেশন প্যাক্ট’ শুক্রবার (১২ জুন) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে সব সদস্যরাষ্ট্রে। নতুন এই অভিন্ন আশ্রয়নীতি ইউরোপের বহিঃসীমান্তে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের নতুন কাঠামো তৈরি করেছে।
একই সময়ে ইইউর সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ইউরোপে অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নীতির প্রভাব এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার ফলেই এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
সীমান্তেই শুরু হবে কড়া যাচাই
নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাধ্যতামূলক ‘স্ক্রিনিং’ বা ফিল্টারিং ব্যবস্থা।
বৈধ ভিসা বা আবাসিক অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তে পৌঁছালে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে তার পরিচয়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিস্তারিত যাচাই করা হবে।
এই সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ভূখণ্ডে প্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না। তাদের সীমান্তবর্তী বিশেষ ট্রানজিট বা অপেক্ষা কেন্দ্রে রাখা হবে।
ইইউর দাবি, এই ব্যবস্থা নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
আশ্রয়ের সম্ভাবনা কম হলে দ্রুত ফেরত
নতুন প্যাক্টের আওতায় যেসব আবেদনকারীর আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, তাদের জন্য দ্রুততর সীমান্ত প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহের মধ্যে আবেদন যাচাই ও সিদ্ধান্ত সম্পন্ন করা হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে সীমান্ত এলাকা থেকেই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে যেসব আবেদন সাধারণ প্রক্রিয়ায় যাবে, সেসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে সংশ্লিষ্ট দেশ সর্বোচ্চ ২০ মাস সময় পাবে।
সীমান্ত রাষ্ট্রগুলোর চাপ কমাতে নতুন সংহতি ব্যবস্থা
দীর্ঘদিন ধরে ইতালি, গ্রিস, স্পেন ও মাল্টার মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলো অভিযোগ করে আসছিল যে, ইউরোপে প্রবেশ করা অধিকাংশ অভিবাসীর চাপ তাদেরই বহন করতে হয়।
এই সমস্যা সমাধানে নতুন প্যাক্টে বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্রে পুনর্বাসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে কোনো দেশ চাইলে নির্ধারিত সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণের পরিবর্তে আর্থিক বা কারিগরি সহায়তা দিয়েও দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এর মাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় যৌথ দায়িত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
শিশুদেরও নেওয়া হবে বায়োমেট্রিক তথ্য
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করা সব ব্যক্তির তথ্য ইউরোড্যাক (Eurodac) ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে।
আগে ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সিদের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হতো। এখন থেকে ছয় বছর বা তার বেশি বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রেও আঙুলের ছাপের পাশাপাশি মুখের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ইইউর মতে, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং একাধিক দেশে একই ব্যক্তির পুনরাবৃত্ত আবেদন রোধে এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
অবৈধ পারাপার কমেছে ৪০ শতাংশ
ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন সীমান্তে প্রায় ৩৯ হাজার অনিয়মিত পারাপারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম।
বিশেষ করে আফ্রিকান রুটগুলোতে অনিয়মিত প্রবেশের হার ৭১ শতাংশ কমেছে। তবে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুটে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে অবৈধ প্রবেশের সংখ্যা উল্টো ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে অভিবাসীরা নতুন নতুন রুট খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
কড়াকড়ির মাঝেও থামছে না মৃত্যুর মিছিল
অবৈধ অভিবাসন কমলেও ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে।
অনেকেই অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় বিপজ্জনক সমুদ্রপথে যাত্রা করেন। ফলে দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
ইউরোপের দরজা কি আরও সংকুচিত হলো?
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ‘অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’ কার্যকর হওয়ার ফলে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলছেন, শুধু সীমান্ত কড়াকড়ি করে অভিবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মূল কারণগুলো মোকাবিলা না করলে মানুষ উন্নত জীবনের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেওয়া বন্ধ করবে না।
ফলে নতুন প্যাক্ট ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনলেও মানবিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক যে থামবে না, তা স্পষ্ট।



