বন্দিত্বের এক বছর, সিনটিকি ক্যাম্পে অভিবাসীদের ক্ষোভ চরমে

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:০৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

গ্রিসের সিনটিকি অভিবাসী ক্যাম্পকে ইউরোপের জন্য ‘মডেল’ হিসেবে প্রচার করেছিল দেশটির সরকার। তবে বাস্তবে ক্যাম্পটি এখন বিক্ষোভ ও অস্থিরতায় ভরপুর। সেখানে আটক থাকা অভিবাসীরা বলছেন, দীর্ঘদিন বন্দি অবস্থায় থাকার কারণে পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে কেউ কেউ আত্মহত্যার কথাও ভাবছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে গ্রিসের সীমান্তে তৈরি এই ক্যাম্পে বর্তমানে প্রায় ৪০০ মিশরীয় ও বাংলাদেশি অভিবাসী আটক রয়েছেন। মাসের পর মাস বন্দি অবস্থায় থাকায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এ নিয়ে পুলিশের সাথে বারবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

গত মাসে অভিবাসীরা এক খোলা চিঠিতে তাদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। সেখানে তারা জানান, তারা ক্লান্ত, খাবারের সংকট রয়েছে এবং শত শত মানুষকে মাত্র চারটি বাথরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে আত্মহত্যার কথাও ভাবছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

গ্রিসে বাংলাদেশি অভিবাসীদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার এক শতাংশেরও কম। মিসর ও পাকিস্তানের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই। নতুন ইউরোপীয় অভিবাসন চুক্তি অনুযায়ী, আশ্রয় আবেদনকারীদের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখার বিধান রয়েছে। আবেদন বাতিল হলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

অভিবাসীরা কাজের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলছেন, কাজ করতে পারলে তারা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারবেন। তাদের ভাষ্য, তারা ১২ মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতিতে থাকার কারণে ক্যাম্পের সবাই যেন ‘টাইম বোম’-এর মতো হয়ে উঠেছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ক্যাম্পের চারটি সেক্টরের মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক অভিবাসী থাকার জায়গা হারিয়েছেন। বৃষ্টির সময় সবাইকে পর্যাপ্ত আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পটি বন্ধ করে মেরামতের দাবি জানিয়েছে। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে ক্যাম্পটি বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

সিনটিকির মেয়র জর্জোস তাতসিওস বলেন, এত মাস ধরে মানুষকে বন্দি রাখা হয়েছে। তারা পালিয়ে গেলে কী করবে, তা কেউ জানে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২০ সালে ক্যাম্পটি চালুর সময় স্থানীয় বাসিন্দারা বন্দুক হাতে গ্রামে পাহারা দিয়েছিলেন।

প্রোমাখোনাস গ্রামের প্রধান স্পাইরোস লিওনিদাস বলেন, ক্যাম্পটির অবস্থানই উপযুক্ত নয়। শীতকালে সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, আবার গ্রীষ্মে ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। তার মতে, এমন পরিবেশে মানুষকে এত মাস বন্দি রাখা কঠিন।

বিক্ষোভের পর ৫০ জনের বেশি অভিবাসী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন। আইনজীবী ইরাকলিস পেকিয়ারিদিস বলেন, তাদের কেউ কেউ ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার চেয়ে কারাগারে যাওয়াকেই পছন্দ করেছেন।

অ্যাক্টিভিস্টরা ক্যাম্পটির পরিবেশকে ‘অমানবিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। সাবেক সংসদ সদস্য আফ্রোদিতি স্টাম্বুলি বলেন, সেখানে দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়, কোনো ফ্রিজ নেই এবং কাপড় ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অনেকের শরীরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিস সিনটিকিকে ‘মডেল প্রকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ক্যাম্পের কঠোর পরিবেশ অভিবাসীদের আগমন নিরুৎসাহিত করতে সহায়তা করছে। তিনি দাবি করেছেন, চলতি বছরে অবৈধ প্রবেশের ঘটনা ১৫ শতাংশ কমেছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রোমাখোনাস গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, এতদিন বড় কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বারবার বিক্ষোভ ও ক্যাম্প থেকে পালানোর ঘটনা ঘটায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।