প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ভারতের, নেপথ্যে কী
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
বিশ্ব অর্থনীতি ঘিরে নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও দেশটির অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। ফিচ রেটিংসও তাদের পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে। এর আগে গত সপ্তাহে মুডিস ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছিল।
ভারতকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন জেপিমরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন। একইসাথে তিনি দেশটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ‘খুবই উজ্জ্বল’ বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ল কেন
অর্থনীতিবিদ ড. অভিনব পি ত্রিপাঠির মতে, প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীল ভোগ, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানোর তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ভারতের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের জিডিপি তথ্যকে দেখা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি অনেক অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, শক্তিশালী শিল্প উৎপাদন, স্থিতিশীল ভোগ, পণ্য রপ্তানি এবং সরকারি বিনিয়োগ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর ভিত্তিতে পুরো অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে সংস্থাটি।
ফিচও প্রথম প্রান্তিকের শক্তিশালী ফলাফলকে পূর্বাভাস বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছে। সংস্থাটির মতে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ধাক্কা এবং বাণিজ্যিক শর্তের অবনতি সত্ত্বেও ভারতের অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ভোগে ভর করছে অর্থনীতি
ভারতের অর্থনীতির আশাবাদী চিত্রের অন্যতম কারণ অভ্যন্তরীণ ভোগ। এশিয়ার অনেক বড় উৎপাদননির্ভর অর্থনীতির তুলনায় রপ্তানির ওপর ভারতের নির্ভরতা কম। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে।
এসঅ্যান্ডপি তাদের পূর্বাভাস বাড়ানোর পেছনে শক্তিশালী ভোগ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছে। একইসাথে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে ভারতের বিনিয়োগের গতিও শক্তিশালী রয়েছে।
টোকিওভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নোমুরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিশেষ করে ভোগকে ভারতের প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়লেও খুচরা জ্বালানির দামে এর সীমিত প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিনিয়োগেও বাড়ছে গতি
ভারতের প্রবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি বিনিয়োগ। সরকারি মূলধনী ব্যয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধির পেছনে সরকারি বিনিয়োগের গতি বাড়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছে এসঅ্যান্ডপি।
বেসরকারি বিনিয়োগেও গতি বাড়ার লক্ষণ দেখছে ফিচ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতে বিনিয়োগ ১০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। জুলাইয়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বছরওয়ারি ১৯ শতাংশে পৌঁছেছিল বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যে রয়েছে ভারত। তারপরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেখা যায়নি।
ফিচের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবের মধ্যেও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা তুলে ধরেছে।
ইরান সংঘাতের মধ্যেও ভারতের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার কথা বলেছে মুডিস। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে।
তবে মুডিস সতর্ক করেছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর কারণে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ভারতের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রপ্তানিতেও বাড়তি গতি
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিতে পণ্য রপ্তানির অবদানও তুলে ধরেছে এসঅ্যান্ডপি। ফলে দেশটির প্রবৃদ্ধি এখন শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল নয়। অভ্যন্তরীণ ভোগ চাহিদা বাড়াচ্ছে, সরকারি ব্যয় বিনিয়োগে সহায়তা করছে, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আসছে এবং রপ্তানি অর্থনীতিতে বাড়তি কর্মকাণ্ড তৈরি করছে।
তবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়লেও অর্থনীতির সব ঝুঁকি দূর হয়নি। এসঅ্যান্ডপি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
সংস্থাটি রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার নীতিসুদ ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানোর সম্ভাবনাও দেখছে। ফিচও শক্তিশালী চাহিদা, মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতির কারণে অক্টোবরে সুদ বাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. ত্রিপাঠির ভাষায়, আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো মূলত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুটা প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হওয়ায় বেশি আশাবাদী। তবে পুরো অর্থবছর নির্বিঘ্ন যাবে—এমন পূর্বাভাস তারা দিচ্ছে না।



