আমেরিকায় দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে অনলাইন বিদ্বেষ বেড়েছে
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ১০:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
আমেরিকায় বসবাসকারী দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও আচরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক পোস্টের সংখ্যা ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৪০ শতাংশ বেড়েছে।
‘দ্য রাইজিং টাইড অব অ্যান্টি-সাউথ এশিয়ান হেট ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক্সে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ১২ হাজার ৯০৪টি বিদ্বেষমূলক পোস্ট শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুনে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৮৪৩টিতে।
গবেষণায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক্সে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৬০টি বিদ্বেষমূলক পোস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এ সময়ের ছয়টি সর্বোচ্চ সংখ্যার মাসের মধ্যে পাঁচটিই ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে।
গবেষকেরা জাতিসংঘের নির্ধারিত ঘৃণাবাক্যের সংজ্ঞা অনুসরণ করে তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন শব্দ, গালি ও বয়ানের ভিত্তিতে পোস্ট শনাক্ত করার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে এমন সমালোচনামূলক পোস্ট বাদ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো ওই সংজ্ঞা অনুযায়ী বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পর্যায়ে পড়ে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক্সে শনাক্ত বিদ্বেষমূলক পোস্টের প্রায় ৪৫ শতাংশে দক্ষিণ এশীয়দের আমেরিকায় ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘চাকরি কেড়ে নেওয়া’ গোষ্ঠী বা জনসংখ্যাগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব বয়ানের সাথে অভিবাসন ও এইচ-১বি ভিসা নিয়ে বিতর্কও যুক্ত ছিল।
দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অবমাননাকর ‘পাজিত’ শব্দটি ও এর বিভিন্ন রূপ এক্সের প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্বেষমূলক পোস্টে পাওয়া গেছে। প্রান্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে এ ধরনের ব্যবহারের হার ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশীয়দের নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন হিসেবে তুলে ধরা পোস্টের সংখ্যা গবেষণার সময়কালে এক্সে ১৭১ শতাংশ বেড়েছে, যা গবেষণায় সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা বয়ান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষকেরা আরও বলেছেন, এসব বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের প্রায়ই একটি অভিন্ন গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে হিন্দু, মুসলিম ও শিখসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও একাকার করে দেখানোর প্রবণতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য, অর্থনৈতিক অসন্তোষ, দক্ষিণ এশীয়দের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যমানতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের বিস্তার। গবেষকেরা এসব কারণকে পরস্পর সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন।
এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিকেও প্রতিবেদনে বিদ্বেষমূলক বয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে অনলাইন বিদ্বেষের উত্থান দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, হয়রানি এবং দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ভুয়া বা বিদ্বেষমূলক অভিযোগ ছড়ানোর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সাথে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে দক্ষিণ এশীয়দের নিয়ে বর্ণবাদী ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতার কথাও বলা হয়েছে।
সিএসওএইচের গবেষণায় শুধু এক্স নয়, ২০২৫ সালে ৪চ্যান, ৮চ্যান ও গ্যাবেও দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ৩ লাখ ৯৭ হাজারের বেশি বিদ্বেষমূলক উল্লেখ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এসব প্ল্যাটফর্মের তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বিদ্বেষের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকেরা মনে করেন, অনলাইনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বাস্তব জীবনের হয়রানি বা সহিংসতা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বয়ান, জাতিগত ধারণা ও কোনো গোষ্ঠীকে অমানবিক হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বাস্তব জীবনেও শত্রুতামূলক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



