চীন যেভাবে বিশ্বের সোনার পরাশক্তি হয়ে উঠল
চৌ চুং-ইয়েন
প্রকাশিত: ৩:০৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২৬
শিল্প খাতে চীনের বৈশ্বিক উত্থান বোঝার ক্ষেত্রে দেশটির সোনা শিল্পের বিকাশ একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একসময় যেখানে চীনের সোনা উৎপাদন ছিল তুলনামূলকভাবে সামান্য, কয়েক দশকের মধ্যে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা উৎপাদক হয়ে উঠেছে।
১৯৭৫ সালে চীন অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের পথে যাত্রা শুরু করার সময় দেশটির বার্ষিক সোনা উৎপাদন ছিল মাত্র ১৩ দশমিক ৮ মেট্রিক টন। তখন দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া উৎপাদনে চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।
তবে কয়েক দশকে পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা উৎপাদক হয় চীন। এরপর থেকে দেশটি শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে চীনের বার্ষিক সোনা উৎপাদন প্রায় ৩৮০ মেট্রিক টন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের এই উত্থানের পেছনে প্রযুক্তি, শিল্পনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৭৯ সালে চীন সোনার নতুন উৎস খুঁজতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। তবে উচ্চমানের আকরিকের বড় মজুদ পাওয়া যায়নি। পরে দেশটির গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের আকরিক থেকে সোনা আহরণের প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়।
এর মধ্যে ‘প্রেসার অক্সিডেশন’ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম সোনার উপস্থিতি থাকা আকরিক থেকেও অর্থনৈতিকভাবে সোনা আহরণের সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের মোট সোনা উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিম্নমানের আকরিকভিত্তিক খনি থেকে আসে।
চীনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো দেশজুড়ে বিভিন্ন মাঝারি আকারের খনি ও শিল্পগুচ্ছের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে উৎপাদন, অর্থায়ন, পরিবহন ও নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করা হয়। ফলে সোনা শিল্পকে শুধু খনি নয়, একটি বিস্তৃত শিল্পব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছে চীন।
এ ছাড়া তামা, সীসা ও দস্তা পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এভাবে চীন বছরে প্রায় ৮০ মেট্রিক টন সোনা উদ্ধার করে।
তবে চীনের সোনা শিল্পের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। ২০১৬ সালে দেশটি রেকর্ড ৪৫৩ দশমিক ৫ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করে। এরপর পরিবেশ ও খনি নিরাপত্তার ওপর কঠোরতা বাড়ানো হয়। ২০১৭ সাল থেকে অবৈধ ও পরিবেশদূষণকারী অনেক খনি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে উৎপাদন কিছুটা কমলেও শিল্পটি আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশ্বের শীর্ষ সোনা উৎপাদক হওয়ার পাশাপাশি চীন বড় পরিমাণে সোনা আমদানিও করে। নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে দেশটি বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন সোনা মজুত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সোনা মজুতের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, ভূরাজনৈতিক বিবেচনাও রয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ইউয়ানের ভূমিকা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি মোকাবিলায় সোনা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চীনের সোনা শিল্পের এই দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ তাই শুধু একটি খনিজ সম্পদের উৎপাদন বাড়ানোর গল্প নয়; বরং প্রযুক্তি, রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতি, পরিবেশনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার উদাহরণ।
(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত)



