‘আমার বাচ্চা হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে, ফেরত দেন’

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬

রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার বছর ছয় মাস বয়সী শিশু আভানের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। শিশুটির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন বাবা মৃদুল ইসলাম। আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’

মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই, আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। সে নাই, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমাকে মেরে ফেলেন। বিশ্বাস করেন, আমার ছেলে হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। তাকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে ওরা মেরে ফেলেছে।’

সন্তানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি চাকরি করি না, বাচ্চাকে স্কুলে দেব বলে ছোট ছোট কাজ করি। আমি ও আমার স্ত্রী পরিকল্পনা করেছি, আর বাচ্চা নেব না। নয়তো আভানের ভালোবাসা কম হবে। ওকে কারো কাছে দিই না। ওকে আমি বাইকে নিয়ে ঘুরি। সে একটা রেড কার কিনবে বলেছে—আমি টাকাও জমা দিয়েছি।’

পরিবারের দাবি, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা শিশুটিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত সন্দেহ করে চিকিৎসা শুরু করেন। তবে হাসপাতালে করা একাধিক পরীক্ষায় ডেঙ্গুর ফল নেগেটিভ আসে। এরপরও একইভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।

তাদের অভিযোগ, গত ২ অক্টোবর কোনো সুস্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা না করেই শিশুটিকে হঠাৎ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। তিনি টেলিফোনে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা চলছিল বলে দাবি পরিবারের।

পরিবারের আরো অভিযোগ, আইসিইউতে নেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেছিল। পরে শনিবার বিকেলে তার মৃত্যু হয়।

স্বজনদের দাবি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সে শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বলে অভিযোগ তাঁদের।

চিকিৎসার নথিপত্র নিয়েও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে পরিবার। স্বজনদের দাবি, নিজেদের ভুলের দায় এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল রিপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে চাপ প্রয়োগ করে তাঁরা নথিপত্র সংগ্রহ করেন।

পরিবারের ভাষ্য, ওই মেডিকেল নথিতে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন ও শক সিনড্রোমের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য ভুল চিকিৎসার সন্দেহকে আরো জোরালো করছে বলে দাবি স্বজনদের।

হাসপাতালের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘ওরা ভাই, ক্যানোলা করতে পারে না। উনাদের কথা কেউ একজন যদি ভালো বলে, আমি এখান থেকে নাকে খত দিয়ে চলে যাব।’

তিনি আরো বলেন, ‘তিন দিন ওয়ার্ডে ছিল। সে খাচ্ছে। বাসা থেকে চিকেন নিয়ে আসছে, সেমাই নিয়ে আসছে। ভিডিও আছে আমাদের কাছে। সে খাচ্ছে আর আমাকে কাছে বলছে—বাবা, তুমি চলে আসো, আমি এখানে থাকব না।’

শিশুটির বাবা মৃদুল ইসলাম একজন গণমাধ্যমকর্মী। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি করেছেন স্বজনরা।

এদিকে হাসপাতাল থেকে শিশুটির মরদেহ নিয়ে স্বজনরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকের ভারে ভেঙে পড়েছে পরিবার।