শর্ত পূরণে ব্যর্থ, বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ৩, ২০২৬
জোরপূর্বক শ্রমের (Forced Labor) মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) এক তদন্তের পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’ (Section 301)-এর অধীনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) ওয়াশিংটন থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন ও বিবৃতি জারি করেছে ইউএসটিআর।
ইউএসটিআর তাদের তদন্ত রিপোর্টে দেশগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে:
-
গ্রুপ ১ (১০% অতিরিক্ত শুল্ক): যেসব দেশ আংশিক নিয়ম কার্যকর করেছে বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির (যেমন ইউএসএমসিএ বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি) মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রমের পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে কানাডা, মেক্সিকো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান।
-
গ্রুপ ২ (১২.৫% অতিরিক্ত শুল্ক): যেসব দেশ সম্পূর্ণভাবে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও এই গ্রুপে রয়েছে যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, সুইজারল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াসহ ৫৪টি দেশ।
তৈরি পোশাক খাতের জন্য ‘টেক্সটাইল মেকানিজম’
বিজ্ঞপ্তিতে একটি বিশেষ ‘টেক্সটাইল মেকানিজম’-এর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য হ্রাসকৃত বা কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি স্বস্তির কারণ হতে পারে কি না, তা পরবর্তী শুনানিতে স্পষ্ট হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) অ্যাম্বাসেডর জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, “আমাদের প্রধান ব্যবসায়িক অংশীদাররা জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে মার্কিন শ্রমিকদের বৈশ্বিক বাজারে একটি অসমান ও বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমরা এই বৈষম্য আর সহ্য করব না।”
ইউএসটিআর-এর তদন্তে বলা হয়েছে, এই ৬০টি দেশের নীতিগত ব্যর্থতার কারণে তৈরি হওয়া সস্তা পণ্য মার্কিন বাজারে প্রবেশ করছে, যা মার্কিন উৎপাদকদের জন্য অসদুপায় ও অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে এবং বৈধভাবে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশের সুযোগ
এই শুল্ক এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা হয়নি। এটি আপাতত একটি প্রস্তাব, যার ওপর অংশীজনদের মতামত ও শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
-
২২ জুন: গণশুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন এবং বক্তব্যের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার শেষ দিন।
-
১ জুলাই: প্রস্তাবিত শুল্কের বিষয়ে লিখিত মতামত বা আপত্তি জমা দেওয়ার শেষ সময়।
-
৬ জুলাই: ইউএসটিআর এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক গণশুনানি করবে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার। নতুন এই প্রস্তাব হুবহু কার্যকর হলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া সমস্ত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১২.৫% শুল্ক যোগ হবে। ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তবে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার বা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো (যেমন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ) যুক্তরাষ্ট্রের এই শুনানিতে অংশ নিয়ে নিজেদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার এবং তৈরি পোশাকের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ ছাড় আদায়ের কূটনৈতিক সুযোগ পাবে।



