যুক্তরাষ্ট্রের সোশ্যাল সিকিউরিটি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
অর্থ সংকটে বিপাকে পড়তে পারেন কোটি কোটি অবসরপ্রাপ্ত
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৬:২৩ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও উত্তরাধিকার ভাতাভোগীদের জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে দেশটির সোশ্যাল সিকিউরিটি প্রশাসন। নতুন এক সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেস দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩২ সালের পর থেকে বর্তমান হারে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা (সোশ্যাল সিকিউরিটি) প্রদান সম্ভব নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীরা প্রাপ্য অর্থের পুরোটা নয়, বরং উল্লেখযোগ্যভাবে কম ভাতা পেতে পারেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সোশ্যাল সিকিউরিটি ট্রাস্টিদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অবসরকালীন ট্রাস্ট ফান্ড ২০৩২ সালের শেষ নাগাদ অর্থশূন্য হয়ে যেতে পারে। গত বছরের পূর্বাভাসের তুলনায় এই সময়সীমা আরও তিন মাস এগিয়ে এসেছে, যা আর্থিক চাপ বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভাতা কমে যেতে পারে ২২ শতাংশ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থ শেষ হয়ে গেলে বেতনভিত্তিক কর ও অন্যান্য উৎস থেকে আসা রাজস্ব দিয়ে বর্তমান ভাতার মাত্র ৭৮ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, নতুন কোনো আইনগত বা আর্থিক সংস্কার না এলে ভাতাভোগীদের প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত কম সুবিধা পেতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে সোশ্যাল সিকিউরিটি কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই লাখো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
অবসর ও অক্ষমতা তহবিল মিলিয়ে ২০৩৪ পর্যন্ত স্বস্তি
ট্রাস্টিরা জানিয়েছেন, অবসরকালীন এবং অক্ষমতা ভাতা—দুই ট্রাস্ট ফান্ড একত্রে বিবেচনা করলে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সুবিধা প্রদান সম্ভব হবে। তবে এরপর সুবিধার মাত্র ৮৩ শতাংশ পরিশোধ করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ডিসএবিলিটি ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ডের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, এটি অন্তত ২১০০ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সুবিধা প্রদানে সক্ষম থাকবে।
মেডিকেয়ারেও বাড়ছে চাপ
শুধু সোশ্যাল সিকিউরিটি নয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেয়ারের আর্থিক অবস্থাও চাপের মুখে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালভিত্তিক সেবা পরিচালনাকারী মেডিকেয়ার পার্ট-এ ট্রাস্ট ফান্ড ২০৩৩ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত পর্যাপ্ত অর্থ নিয়ে চলতে পারবে। এরপর নির্ধারিত সুবিধার মাত্র ৮৯ শতাংশ অর্থ প্রদান করা সম্ভব হবে।
তবে চিকিৎসা সেবা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যয় বহনকারী মেডিকেয়ার পার্ট-বি এবং পার্ট-ডি আপাতত স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এগুলো মূলত প্রিমিয়াম ও ফেডারেল অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এদিকে ২০২৭ সালে মেডিকেয়ার পার্ট-বি’র মাসিক প্রিমিয়াম বেড়ে ২০৯ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে ২০২ দশমিক ৯০ ডলার।
কত মানুষ নির্ভরশীল?
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন নাগরিক সোশ্যাল সিকিউরিটির অবসর ও উত্তরাধিকার ভাতা পেয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৮০ লাখ মানুষ অক্ষমতা ভাতা গ্রহণ করেছেন।
একই সময়ে মেডিকেয়ার কর্মসূচিতে নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি।
কেন বাড়ছে সংকট?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্য, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জন্মহার কমে যাওয়ার ফলে কর্মরত মানুষের তুলনায় অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে সোশ্যাল সিকিউরিটি ও মেডিকেয়ার তহবিলের ওপর আর্থিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক করনীতি ও অভিবাসন নীতিকেও এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর আওতায় প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধার ওপর কর আদায় কমে যাবে এবং ট্রাস্ট ফান্ডে অর্থপ্রবাহও হ্রাস পাবে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের হিসাব অনুযায়ী, এই কর পরিবর্তনের কারণে আগামী এক দশকে ট্রাস্ট ফান্ডের আয় প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে।
অভিবাসন নীতিরও প্রভাব
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাটো ইনস্টিটিউটের বাজেট ও সামাজিক নিরাপত্তা নীতির পরিচালক রোমিনা বচিয়া বলেছেন, প্রবীণদের জন্য নতুন কর ছাড় বর্তমান সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি চাপ বহন করতে হবে ভবিষ্যৎ কর্মজীবী প্রজন্মকে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, কঠোর অভিবাসন নীতিও ভবিষ্যতে তহবিলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বহু অভিবাসী নিয়মিত কর প্রদান করলেও কখনো সোশ্যাল সিকিউরিটি সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন না। ফলে তাদের করের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে এই তহবিলকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।
সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, সোশ্যাল সিকিউরিটি ও মেডিকেয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হতে পারে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে এই বিষয়টি দেশটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: আমেরিকা বাংলা



