স্থায়ী হলো ভিসা বন্ড, দুর্যোগ না সুযোগ?

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৪:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০২৬

বাংলাদেশসহ ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য আমেরিকার ভিসা বন্ড ব্যবস্থা এবার স্থায়ী করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে চালু থাকা এই ব্যবস্থা ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট থেকে স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়েছে। ফলে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য আমেরিকার B1 ও B2 ভিসা প্রক্রিয়ায় নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা যুক্ত হলো।

আগে এই ভিসা বন্ডের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার মার্কিন ডলার। নতুন ব্যবস্থায় বন্ডের পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ হাজার, ১৫ হাজার অথবা ২০ হাজার মার্কিন ডলার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানসহ মোট ৫০টি দেশকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে আফ্রিকার প্রায় ৩০টি দেশ রয়েছে। অর্থাৎ এসব দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভিসা আবেদন অনুমোদিত হলেও সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে ভিসা বন্ড দেওয়ার শর্ত আরোপ করতে পারবেন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি-ভিসা বন্ড মানেই ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। বরং একজন আবেদনকারীর ভিসা অনুমোদনের পর কনস্যুলার কর্মকর্তা তাকে নির্ধারিত অর্থের বন্ড দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। বন্ডের পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার, ১৫ হাজার অথবা ২০ হাজার মার্কিন ডলার।

আমেরিকান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা ভিসা বন্ড কর্মসূচি কার্যকর হয়েছে। এই কর্মসূচি চালুর আগে সংশ্লিষ্ট ৫০টি দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি অর্থবছরে প্রায় ৪৫ হাজার ৪৮৮ জন আমেরিকায় গিয়ে নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালুর পরবর্তী ১০ মাসে এই সংখ্যা ৫০ জনেরও নিচে নেমে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ, ভিসা বন্ড ব্যবস্থা চালুর পর নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থানের ঘটনা নাটকীয়ভাবে কমেছে। আমেরিকান সরকারের হিসাবে, এই ৫০টি দেশের ক্ষেত্রে ভিসা দেওয়ার হারও প্রায় ৮৩ শতাংশ কমেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বন্ডের আর্থিক দায় এবং আবেদনকারীদের মধ্যে এ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকে দেখা হচ্ছে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক আবেদনকারী ভিসা অনুমোদিত হওয়ার পরও বন্ডের অর্থ পরিশোধ করে ভিসা গ্রহণ করেননি। আবার অনেকে বন্ডের সম্ভাবনার কারণে শুরুতেই ভিসার আবেদন থেকে বিরত থেকেছেন। ফলে আবেদনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে, যা বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ভিসার আবেদন কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সাক্ষাৎকারের চাপও কমতে পারে। ফলে আগে যেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে তুলনামূলকভাবে দ্রুত সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সাথে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের কাছে আবেদনকারীদের সাথে কথা বলার জন্যও তুলনামূলক বেশি সময় থাকতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। যেসব আবেদনকারী ভিসা অনুমোদনের পরও বন্ড দিতে অনাগ্রহী হয়ে শেষ পর্যন্ত ভিসা গ্রহণ করছেন না, তাদের কারণে অনুমোদিত ভিসার একটি অংশ কার্যকর ভ্রমণে রূপ নিচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে কনস্যুলার কর্মকর্তারা আবেদনকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য, আর্থিক সক্ষমতা, নিজ দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও সূক্ষ্মভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

অর্থাৎ, ভিসা বন্ড একদিকে যেমন আবেদনকারীদের জন্য বড় আর্থিক চাপ, অন্যদিকে এটি প্রকৃত ও যোগ্য ভ্রমণকারীদের জন্য একটি সম্ভাব্য সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে এই সুযোগকে কোনোভাবেই ভিসা পাওয়ার সহজ পথ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বন্ডের শর্ত আরোপ করা হবে কি না, সেটি কনস্যুলার কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। একই সাথে বন্ডের আওতায় থাকা ব্যবস্থায় এমন একটি বিধানও রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার কর্মকর্তা বিশেষ ক্ষেত্রে বন্ড ছাড়াই ভিসা দেওয়ার সুপারিশ করতে পারেন। এই বিধানের বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা সময়ের সাথে আরও স্পষ্ট হবে।

বাংলাদেশি ভিসা আবেদনকারীদের তাই এখন নতুন বাস্তবতা বুঝে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে B1, B2 ও B1/B2 ভিসার আবেদনকারীদের নিজেদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য, আর্থিক সক্ষমতা, পেশাগত ও পারিবারিক বন্ধন এবং নির্ধারিত সময় শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসার যৌক্তিকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

ভিসা বন্ড ব্যবস্থাকে শুধু অতিরিক্ত অর্থের বোঝা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি আমেরিকার ভিসা ব্যবস্থায় একটি নীতিগত পরিবর্তন, যার প্রভাব আবেদনকারীর সংখ্যা, ভিসা দেওয়ার হার এবং ভিজিটরদের আচরণ-সবকিছুর ওপর পড়তে পারে।

পরবর্তী সময়ে আমেরিকান সরকারের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, এই স্থায়ী ভিসা বন্ড ব্যবস্থা বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য বাস্তবে কতটা কঠিন এবং একই সাথে কতটা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা