অভিবাসন নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক: ফরাসি গবেষণা
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৮:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০২৬
ফ্রান্সে অভিবাসন বিষয়ে জনপরিসরে প্রচলিত অনেক ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না—এমনটাই উঠে এসেছে দেশটির দুটি শীর্ষ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনেদ (INED) ও ইনসে (INSEE) পরিচালিত এক বিস্তৃত জরিপে। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার এই গবেষণা প্রতিবেদনে অভিবাসীদের জীবন, সামাজিক একীভূতকরণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অনিয়মিত অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
গবেষণাটি “ত্রাজেক্তুয়ার এ অরিজিন ২ (TEO2)” শীর্ষক জরিপের অংশ, যেখানে ২০১৯ ও ২০২০ সালে ফ্রান্সে বসবাসরত ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ২৭ হাজার মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত অভিবাসী এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম।
গবেষকদের মতে, অভিবাসীরা নিজেদের আলাদা গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ থাকেন—এমন ধারণা বাস্তবে দুর্বল। জরিপে দেখা গেছে, ৩৯ শতাংশ অভিবাসীর জীবনসঙ্গী ভিন্ন পটভূমির, আর দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। গবেষক পাত্রিক সিমোর ভাষায়, “ফ্রান্সে মিশ্র সম্পর্কই প্রধান বাস্তবতা, বিচ্ছিন্ন কমিউনিটি নয়।”
বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ফরাসিদের অর্ধেকের বেশি জানিয়েছেন তাদের বন্ধুরা একই পটভূমির, অথচ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই হার অনেক কম। অর্থাৎ সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ধারণা বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বেশি দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনিয়মিত অভিবাসন নিয়েও প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচজনের একজন জীবনের কোনো পর্যায়ে কাগজপত্রহীন অবস্থায় ছিলেন, তবে এই হার দীর্ঘ সময় ধরেই স্থিতিশীল। একইসঙ্গে মাত্র ৯ শতাংশ অভিবাসী ভিসা ছাড়া ফ্রান্সে প্রবেশ করেছেন।
গবেষকরা আরও দেখিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে অনেক অভিবাসীর অবস্থান বৈধ হয়ে ওঠে—এক-চতুর্থাংশ পরবর্তীতে রেসিডেন্ট কার্ড পান এবং সমান সংখ্যক নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
শিক্ষাগত দিক থেকেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে আগত অভিবাসীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত, যেখানে ১৯৮৯ সালের আগে এই হার ছিল মাত্র ২৯ শতাংশ। তবে বৈষম্য এখনো একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অভিবাসীরা কর্মসংস্থান, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলক বেশি বাধার মুখে পড়ছেন।
আবাসন সংকটও অভিবাসীদের পরিস্থিতিকে জটিল করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দশকে গৃহহীনতার ঝুঁকি কিছুটা বেড়েছে এবং অনেক অভিবাসী নিম্নমানের বা প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে গবেষকরা বলছেন, ফ্রান্সে অভিবাসন নিয়ে জনপরিসরের অনেক ধারণা অতিরঞ্জিত বা অসম্পূর্ণ। বাস্তবতা হলো—অভিবাসীরা ধীরে ধীরে সমাজে একীভূত হচ্ছেন, তবে বৈষম্য ও আবাসন সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।



