গ্রিন কার্ডের নামে প্রতারণা, স্বপ্নের পথে যেন সর্বনাশ না হয়

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬

আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের অসংখ্য মানুষ। গ্রিন কার্ড, ভিসা কিংবা কাজের অনুমতি—একটি অনুমোদন অনেকের জীবন বদলে দিতে পারে। আর এই স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকেই পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রতারকচক্র। ‘দ্রুত গ্রিন কার্ড’, ‘বিশেষ যোগাযোগ’, ‘নিশ্চিত অনুমোদন’—এমন নানা প্রলোভনে অভিবাসীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়।

আমেরিকার নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা—ইউএসসিআইএসও এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ইউএসসিআইএসের সাথে বিশেষ যোগাযোগ রয়েছে কিংবা তারা দ্রুত অনুমোদন করিয়ে দিতে পারে—এমন দাবি বিশ্বাস করার কারণ নেই। ইউএসসিআইএস স্পষ্টভাবে বলেছে, ফলাফল বা দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া প্রতারণার অন্যতম সতর্কসংকেত।

অভিবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। আবেদনকারীর যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় নথি এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনের ধরন অনুযায়ী প্রক্রিয়াকরণের সময়ও ভিন্ন হয়। ইউএসসিআইএস নিজেই বিভিন্ন আবেদনের বর্তমান প্রক্রিয়াকরণ সময় প্রকাশ করে। তাই কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর কথায় ‘গোপন পথ’ বা ‘ভেতরের যোগাযোগে দ্রুত অনুমোদন’ পাওয়ার আশা করা বিপজ্জনক।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অর্থ হারানোতেই শেষ নয়। প্রতারকের পরামর্শে কেউ যদি মিথ্যা তথ্য বা ভুয়া নথি জমা দেন, তাহলে তার অভিবাসন আবেদনই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইউএসসিআইএস সতর্ক করেছে, কোনো খালি ফরমে স্বাক্ষর করা কিংবা মিথ্যা তথ্য থাকা কোনো নথিতে স্বাক্ষর করা উচিত নয়।

এখানে অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কার কাছ থেকে আইনি পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে, তা যাচাই করা। ইউএসসিআইএসের নির্দেশনা অনুযায়ী, অভিবাসন বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদিত আইনজীবী বা স্বীকৃত প্রতিনিধির সহায়তা নেওয়া উচিত। শুধু ‘ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট’, ‘এজেন্ট’ বা ‘নোটারি’ পরিচয় থাকলেই কেউ আইনি পরামর্শ দেওয়ার অনুমতি পান না।

আরেকটি বড় বিপদ হলো ভুয়া ওয়েবসাইট। দেখতে সরকারি ওয়েবসাইটের মতো হলেও অনেক সাইট আসলে প্রতারণার জন্য তৈরি হতে পারে। তাই অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি .gov ওয়েবসাইট ব্যবহার করা উচিত। ইউএসসিআইএসও আবেদনকারীদের সরকারি উৎস থেকে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

অভিবাসীদের মনে রাখতে হবে, সরকারি ফরম ও তথ্যের জন্য অযথা কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। কেউ সহায়তা নিলে তার যোগ্যতা যাচাই করতে হবে, অর্থ পরিশোধ করলে রসিদ নিতে হবে এবং নিজের মূল নথি নিরাপদে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই না বুঝে খালি ফরমে স্বাক্ষর করা যাবে না।

প্রতারণার শিকার হলে নীরব থাকাও সমাধান নয়। ইউএসসিআইএসের মাধ্যমে সন্দেহজনক অভিবাসন প্রতারণার তথ্য ও প্রমাণ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সংস্থার নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থায় ঘটনার বিস্তারিত এবং প্রাসঙ্গিক নথি জমা দেওয়া যায়।

অভিবাসন একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি একজন মানুষের ভবিষ্যৎ অভিবাসন প্রক্রিয়াতেও পড়তে পারে। তাই ‘দ্রুত’, ‘নিশ্চিত’ কিংবা ‘বিশেষ যোগাযোগ’—এমন শব্দ শুনে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তথ্য যাচাই করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

গ্রিন কার্ডের স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—সরকারি তথ্য, বৈধ প্রক্রিয়া এবং যাচাই করা আইনগত সহায়তা। শর্টকাটের লোভে যেন সেই স্বপ্নই বড় বিপদের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি

সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা