ট্রাম্পের বহিষ্কার অভিযান: সামনে আরও কঠিন সময়?
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও কঠোর হচ্ছে অভিবাসন প্রয়োগ; বৈধ কাগজপত্র, আইনি প্রস্তুতি ও সঠিক তথ্যই হতে পারে সুরক্ষার ভিত্তি
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসী বহিষ্কারের অভিযান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের (এমপিআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত আমেরিকা থেকে প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বছরে ১০ লাখ মানুষ বহিষ্কারের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ না হলেও বহিষ্কারের গতি আগের প্রশাসনের বার্ষিক গড়ের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে আমেরিকার অভ্যন্তরে আটক ব্যক্তিদের বহিষ্কারের হারও বাড়ছে। এসব প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে সাময়িক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে সামনে বহিষ্কারের সংখ্যা ঠিক কত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এমপিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বহিষ্কারের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এটি একটি পূর্বাভাস, চূড়ান্ত হিসাব নয়। প্রশাসনের নীতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা, অভিবাসন আদালতের সিদ্ধান্ত, মামলার জট এবং নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা ভবিষ্যতের সংখ্যাকে প্রভাবিত করবে। অতএব, বহিষ্কার আরও বাড়বেই—এমন নিশ্চিত দাবি না করে বলা যায়, কঠোর প্রয়োগ অব্যাহত থাকলে অভিবাসনপ্রত্যাশী ও অনিয়মিতভাবে বসবাসরত মানুষের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বহিষ্কারের আওতা শুধু অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়
এমপিআইয়ের বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বহিষ্কৃতদের বড় অংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ১৮ মাসে মোট বহিষ্কারের প্রায় ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড পাওয়া গেছে। আমেরিকায় অন্তত দুই বছর বসবাসের পর বহিষ্কৃতদের ৭১ শতাংশের কোনো ফৌজদারি দণ্ডের রেকর্ড ছিল না। অন্তত ১০ বছর ধরে দেশটিতে বসবাস করা বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রে এ হার ৬১ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, শুধু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেই বহিষ্কার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। অভিবাসন আইনের অধীনে কারও অবস্থান বৈধ কি না, তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ আছে কি না এবং তাঁর আবেদনের আইনি অবস্থা কী—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন আমেরিকায় বসবাস, সেখানে কাজ করা কিংবা পরিবারের সদস্য থাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কারের ঝুঁকি দূর করে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক অভিবাসী সমান ঝুঁকিতে রয়েছেন বা বৈধ ভিসাধারীরাও একইভাবে বহিষ্কারের মুখে পড়বেন। ব্যক্তির অভিবাসন-অবস্থা, প্রবেশের ইতিহাস, ভিসার শর্ত, চলমান মামলা ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন নিজের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা এবং যথাযথ প্রস্তুতি।
আমেরিকায় যেতে ইচ্ছুকদের করণীয়
আমেরিকায় পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন—এমন ব্যক্তিদের জন্য প্রথম কাজ হলো বৈধ পথ ও সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা। ভিসা পাওয়া মানেই সব ধরনের অভিবাসন-সুবিধা পাওয়া নয়; প্রতিটি ভিসার নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শিক্ষার্থী ভিসায় যেতে চাইলে স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য, পড়াশোনার উদ্দেশ্য এবং ভিসার শর্ত পূরণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চাকরির উদ্দেশ্যে গেলে নিয়োগকর্তা, কাজের অনুমতি ও ভিসার বৈধতা যাচাই করা জরুরি। পর্যটক বা ভিজিটর ভিসায় গিয়ে অনুমতি ছাড়া কাজ করা কিংবা ভিসার শর্ত ভেঙে দীর্ঘদিন অবস্থানের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
দালাল বা অননুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভিসার আবেদন কিংবা বিপজ্জনক পথে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নিশ্চিতভাবে আমেরিকায় প্রবেশ, চাকরি কিংবা স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে তার দাবির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আমেরিকার সরকারি ওয়েবসাইট এবং যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
যারা ইতিমধ্যে আমেরিকায় আছেন
আমেরিকায় বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া আরও জরুরি। প্রথমত, নিজের ভিসা, বসবাসের অনুমতি, কাজের অনুমোদন, আদালতের নথি ও অন্যান্য অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র হালনাগাদ রাখা প্রয়োজন। আবেদনের রসিদ, অনুমোদনপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি চিঠির নিরাপদ কপি সংরক্ষণ করতে হবে। ঠিকানা পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর বাধ্যবাধকতা আছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, অভিবাসন আদালত বা সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো নোটিশ এলে তা উপেক্ষা করা যাবে না। শুনানির তারিখ, আপিলের সময়সীমা এবং প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে দ্রুত আইনগত পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারও বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ থাকলে কিংবা আশ্রয়ের আবেদন বিচারাধীন থাকলে তাঁর করণীয় অন্যদের থেকে আলাদা হতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নিজের মামলার নথি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, গ্রেপ্তার বা আটক হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আগে থেকেই একজন যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর যোগাযোগের তথ্য এবং পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথির তথ্য ভাগ করে রাখা যেতে পারে। তবে আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথিতে স্বাক্ষর করা বা নিজের মামলার বিষয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রত্যেকের অধিকার ও আইনি বিকল্প এক নয়; তাই ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বুঝে পরামর্শ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি
কঠোর অভিবাসননীতি মানেই আইনি অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়। আমেরিকায় আটক বা বহিষ্কারের মুখে পড়া ব্যক্তির কী অধিকার রয়েছে, তা তাঁর অবস্থান ও মামলার ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে। আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তও অভিবাসন প্রয়োগের কিছু নীতিকে সীমিত বা পরিবর্তন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ফেডারেল আপিল আদালত তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের বহিষ্কারের একটি নীতিকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছিল। এ ধরনের আইনি পরিবর্তন দেখায়, প্রশাসনের নীতির পাশাপাশি আদালতের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিবাসীদের তাই ভয়ভীতি ছড়ানো পোস্ট, পুরোনো তথ্য কিংবা যাচাইহীন আইনি পরামর্শের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। সরকারি ঘোষণা ও আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য নিতে হবে। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তা চাওয়া কোনো অপরাধ নয়।
সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে
অভিবাসন আইন প্রয়োগ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সেই প্রয়োগে স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। বহিষ্কারের সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া না গেলে নীতির প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমপিআই জানিয়েছে, আমেরিকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর থেকে অভিবাসনবিষয়ক বিস্তারিত মাসিক পরিসংখ্যান প্রকাশ সীমিত করায় গবেষকদের বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে হিসাব করতে হয়েছে।
সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা থাকলে কতজনকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, তাঁদের কতজনের অপরাধে দণ্ডের রেকর্ড রয়েছে, কতজনের মামলা বিচারাধীন এবং কতজনকে সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হয়। এতে জনসাধারণের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক ও গবেষকেরাও অভিবাসননীতির বাস্তব ফলাফল মূল্যায়ন করতে পারেন।
আতঙ্ক নয়, বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতি
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি আগামী দিনে কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আইনি বাধার ওপর। তবে বর্তমান পরিসংখ্যান অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: অনিয়মিত পথে আমেরিকায় প্রবেশ, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন কিংবা ভুয়া নথির ওপর নির্ভর করা ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
যাঁরা আমেরিকায় যেতে চান, তাঁদের উচিত বৈধ অভিবাসনপথ বেছে নেওয়া, আবেদনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা। আর যাঁরা ইতিমধ্যে সেখানে বসবাস করছেন, তাঁদের উচিত নিজেদের আইনি অবস্থান বুঝে প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ, সরকারি নোটিশের জবাব দেওয়া এবং প্রয়োজনে যোগ্য আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া।
অভিবাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুজব কিংবা আতঙ্ক নয়—সঠিক তথ্য, বৈধ প্রক্রিয়া ও সময়মতো আইনি প্রস্তুতিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা


