আমেরিকায় ওয়ার্ক পারমিটের নতুন নিয়ম, বাড়ছে উদ্বেগ
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ২:৪৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
বিদেশে কর্মসংস্থান শুধু ব্যক্তির জীবিকা অর্জনের পথ নয়, অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অন্যতম ভিত্তি। বিশেষ করে আমেরিকার মতো দেশে কাজের সুযোগ পেলে বহু অভিবাসী নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু কাজের অনুমতিপত্র নবায়নের নিয়মে কড়াকড়ি আরোপ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা সীমিত হওয়ায় বিদেশি কর্মীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। নিয়মিত কাজ করেও শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS) কাজের অনুমতিপত্র বা এমপ্লয়মেন্ট অথরাইজেশন ডকুমেন্টের (EAD) মেয়াদ নবায়নের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা সীমিত করেছে। আগে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সময়মতো নবায়নের আবেদন করা যোগ্য কর্মীরা আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫৪০ দিন কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুবিধা পেতে পারতেন। নতুন বিধিতে নির্দিষ্ট শ্রেণির আবেদনের ক্ষেত্রে এ সুবিধা আর প্রযোজ্য হবে না। ফলে অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের অনুমোদন না পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাজ বন্ধ রাখতে হতে পারে।
অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নিয়মকানুন থাকা প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্ব হলো কারা বৈধভাবে কাজ করছেন, তাঁদের অনুমতির মেয়াদ কত দিন এবং কোন শর্তে কর্মসংস্থান চালিয়ে যেতে পারবেন, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি এমন ব্যবস্থাও থাকা দরকার, যাতে আবেদন প্রক্রিয়াকরণের অনিবার্য বিলম্বের দায় বৈধভাবে কাজ করা কর্মীদের ওপর অযৌক্তিকভাবে না পড়ে।
এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, একজন কর্মী যথাসময়ে নবায়নের আবেদন করেও যদি অনুমোদন পেতে দেরির কারণে কাজ হারান, তাহলে তাঁর আর্থিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে। নিয়মিত বেতন থেকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটানো কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানে সাময়িক বিরতিও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। যাঁদের আয়ের ওপর দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা নির্ভরশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়োগকর্তারাও সমস্যায় পড়তে পারেন। অভিজ্ঞ কর্মীর কাজের অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাঁকে সাময়িকভাবে কাজ থেকে বিরত রাখতে হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মী ও নিয়োগকর্তার মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব খাতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে অনুমতিপত্র নবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখা সবার স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকার সরকারের উচিত বৈধ অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের নিয়ম কার্যকর করার পাশাপাশি আবেদন নিষ্পত্তির সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। আবেদনকারীরা যেন সহজে নিজেদের আবেদনের অবস্থা জানতে পারেন, প্রয়োজনীয় নথির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা পান এবং সম্ভাব্য বিলম্ব সম্পর্কে আগাম ধারণা লাভ করেন, সে ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো শ্রেণির কর্মীর জন্য স্বয়ংক্রিয় মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা বন্ধ করা হলে তার প্রভাব, ব্যতিক্রম ও কার্যকর হওয়ার সময় সম্পর্কেও পরিষ্কার তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
একই সঙ্গে বিদেশি কর্মীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগে নবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া, প্রয়োজনীয় নথি গুছিয়ে রাখা এবং সরকারি নির্দেশনা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করলেই কাজের অনুমতি বহাল থাকবে—এমন ধারণা করা উচিত নয়। প্রত্যেক কর্মীকে নিজের অনুমতিপত্রের শ্রেণি অনুযায়ী প্রযোজ্য নিয়ম ও ব্যতিক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। প্রয়োজনে যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। আমেরিকায় কাজ করা বাংলাদেশিরা নতুন নিয়মের আওতায় পড়েন কি না, তা তাঁদের ব্যক্তিগত অভিবাসন-অবস্থা ও কাজের অনুমতিপত্রের শ্রেণির ওপর নির্ভর করবে। তাই সবার চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে—এমন সাধারণীকরণ যেমন ঠিক নয়, তেমনি পরিবর্তনটির সম্ভাব্য প্রভাবকে হালকাভাবে দেখাও উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বিভ্রান্তিকর প্রচার ঠেকানো জরুরি।
শেষ পর্যন্ত, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা শুধু কঠোর নিয়ম প্রণয়নের ওপর নির্ভর করে না; নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দক্ষ প্রশাসন ও আবেদনকারীদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার সরকার যদি কর্ম-অনুমতির বৈধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নবায়ন প্রক্রিয়ার জট কমাতে পারে, তাহলে কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে। আর প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে বৈধ কর্মীরা যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিবাসননীতি কঠোর হতে পারে, কিন্তু তার প্রয়োগে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও মানবিক বিবেচনার ঘাটতি থাকা উচিত নয়।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা



