মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় তেলের দাম মে মাসের পর সর্বোচ্চ
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৬:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথে হামলার ঘটনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এটি ১৮ মের পর সর্বোচ্চ দাম।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ ডলার ৬ সেন্ট বা ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলার ৮৮ সেন্টে দাঁড়ায়। দিনের লেনদেনে একপর্যায়ে দাম ১১২ ডলার ৫৫ সেন্টে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ২ ডলার ৪ সেন্ট বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ১৯ সেন্ট হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথে হামলার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগও বাজারে প্রভাব ফেলছে।
হরমুজ প্রণালি ও সৌদি আরবে হামলার প্রভাব
তেলবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান পিভিএমের বিশ্লেষক তামাস ভার্গা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সংঘাত শুরুর আগের পর্যায়ে পৌঁছানোর খবরের চেয়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হুতি বিদ্রোহীদের হামলার প্রভাব বেশি।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা কম। ফলে তেলের দাম উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে।
মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে।
সৌদি আরবে হামলার পর নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। রয়টার্সের ছয়টি সূত্র জানিয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ধাহরানে অবস্থিত সদর দপ্তর থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন কূটনৈতিক মিশন থেকে কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তর। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন আমেরিকার কর্মকর্তারা।
জাহাজ ও তেলক্ষেত্রে হামলার খবর
বুধবার সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হতাহতের পাশাপাশি একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, উত্তর উপসাগরে অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত চারটি জাহাজে বুধবার হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ মাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।
লিবিয়াতেও তেল উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটেছে। দেশটির হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল পরিবহনের একটি পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে দুই তেলক্ষেত্রের উৎপাদন কমেছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন লিবিয়ার জাতীয় তেল করপোরেশনের প্রধান।
জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির জরুরি হিটিং অয়েল মজুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ডিজেলের ঘাটতি এবং আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেও জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট তেল ও গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে মিথেন নিঃসরণসংক্রান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধি কার্যকরে তিন বছর বিলম্বের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আমেরিকার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিনের দাবি, আগামী মাসে আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে সম্মত হয়েছেন পুতিন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও আলোচনায় সমর্থন জানিয়েছেন।



