মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তেলের বাজারে অস্থিরতা, বাড়তে পারে দাম
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৩:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২৬
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্টের দামও প্রায় ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে। তবে শিগগিরই দাম কমার পূর্বাভাসও রয়েছে।
ইয়াহু ফাইন্যান্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইলিয়াম ব্লেয়ারের জ্বালানি খাতের গবেষণা বিশ্লেষক নিল ডিংম্যান তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের সম্ভাবনা দেখছেন। ইয়াহু ফাইন্যান্সের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ব্রুক ডিপালমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বড় তেল কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা যে ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন, তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।
তেলের স্বাভাবিক দামও বাড়তে পারে
ডিংম্যানের মতে, আগে বিশ্লেষকেরা তেলের স্বাভাবিক দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ ডলার ধরে হিসাব করতেন। এখন সেই ধারণা বদলে দাম ৮০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর মতো ঘটনা তেলের সরবরাহ ও বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ভূরাজনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলো সরাসরি সরবরাহে প্রভাব ফেলায় বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
লাভবান হচ্ছে তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি
তেলের দাম বাড়ায় আমেরিকার জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশটির শেয়ারবাজারে জ্বালানি খাতের শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ১১টি খাতের মধ্যে এ খাতেই সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সূচকটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ।
গত ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে আমেরিকার অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে বিশ্ববাজারে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
ডিংম্যানের আশঙ্কা, সরবরাহে সংকট তৈরি হলে তা সামাল দিতে তেলের মজুত থেকে সরবরাহ বাড়ানো বা অন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে। তাঁর মতে, আমেরিকার তেলের মজুত ইতিমধ্যে ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম নিয়েও উদ্বেগ
তেলের পাশাপাশি ডিজেলের দাম নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ডিজেলের দামের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হিটিং অয়েলের আগাম চুক্তির দাম চলতি বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। হিটিং অয়েল মূলত ঘরবাড়ি গরম রাখতে ব্যবহৃত হয়।
ডিংম্যানের মতে, তেলের বাজারে ইতিমধ্যে রেকর্ড উচ্চ দাম দেখা গেছে এবং সামনে তা আরও বাড়তে পারে। শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ডিজেল, পেট্রল ও ঘরবাড়ি গরম রাখার জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
তেলের দাম বাড়লে সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে। অন্যদিকে, তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর আয় বাড়তে পারে। ডিংম্যান জানান, তাঁর বিশ্লেষণের আওতায় থাকা বেশির ভাগ তেল কোম্পানি চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে রেকর্ড পরিমাণ অবাধ নগদ প্রবাহের কথা জানিয়েছে। তৃতীয় বা চতুর্থ প্রান্তিকেও নতুন রেকর্ড হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
দাম কমার পূর্বাভাসও রয়েছে
তবে সব বিশ্লেষক তেলের দামে শিগগিরই বড় ধরনের উল্লম্ফনের আশঙ্কা করছেন না। সোমবার গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী ডিসেম্বরে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার এবং আমেরিকার অপরিশোধিত তেলের দাম ৮১ ডলারে নেমে আসতে পারে। এ দুই দামই বর্তমান বাজারদরের চেয়ে কম।
তবে ব্যাংকটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, তেলের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, জাহাজে হামলা বাড়লে অথবা নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপরই আগামী দিনে তেলের দামের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।



