জাপানের শ্রমবাজার ধরতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ?
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
জাপানে তীব্র শ্রমিকসংকট, অন্যদিকে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় লাখো তরুণ। দুই দেশের এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে বিদেশে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ। কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা, জাপানি ভাষায় পারদর্শিতা এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার অভাবে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতির দেশ জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে কমছে কর্মক্ষম জনসংখ্যা। ফলে বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশ প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেনি।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক সেলিম রেজার এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের এই ব্যর্থতার পেছনে নীতিগত দুর্বলতা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং নিয়োগব্যবস্থার নানা সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?
জাপানের শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। ২০০৫ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তির পরও প্রথম আট বছরে বাংলাদেশ থেকে জাপানে কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়েছিল মাত্র ৪১ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো—বিএমইটি পাঠায় ১২ জন এবং বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো পাঠায় ২৯ জন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে নির্দিষ্ট দক্ষতাভিত্তিক কর্মী বা এসএসডব্লিউ কর্মসূচির আওতায় কর্মী পাঠানোর পথও তৈরি হয়। তবে এসব উদ্যোগ বড় পরিসরে ও ধারাবাহিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।
বাংলাদেশের চারটি বড় দুর্বলতা
প্রথমত, চাকরির চাহিদা যাচাই না করেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জাপানের নিয়োগকর্তারা কোন খাতে কতজন কর্মী চান এবং তাঁদের কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তা বিবেচনা না করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হলে প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, জাপানি ভাষা শিক্ষায় ঘাটতি রয়েছে। জাপানে কাজ করতে শুধু কারিগরি দক্ষতা যথেষ্ট নয়; কর্মক্ষেত্রের নির্দেশনা বোঝা, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার জন্য ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ভাষা শিক্ষা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
তৃতীয়ত, অভিবাসন ব্যয় ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক কর্মীকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে বিদেশে যাওয়ার আগেই ঋণের বোঝা বাড়ে। অন্যদিকে, জাপানি নিয়োগকর্তাদের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য প্রশিক্ষণ এবং কর্মীদের সঠিক যাচাই।
চতুর্থত, প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো জাপানের শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু বিপুল জনসংখ্যা থাকলেই যে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এগিয়ে থাকা যায় না, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তারই উদাহরণ।
কী করতে হবে বাংলাদেশকে?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে আসা সমস্যাগুলো সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। জাপানের কোন খাতে কত কর্মীর চাহিদা রয়েছে, তা যাচাই করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণের সাফল্য শুধু সনদ বিতরণের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং কতজন কর্মী চাকরি পেলেন এবং তাঁদের আয় কেমন হলো, তা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে জাপানি ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা পরীক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দিলে চলবে না। প্রয়োজন দক্ষ, ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য কর্মী তৈরি করা।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে, নাকি সম্ভাবনার এই সুযোগও যথাযথভাবে কাজে লাগানো হবে না?
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সেলিম রেজার বিশ্লেষণ



