অর্থনীতি ভালো, তবু চাপে ট্রাম্প: মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ই বড় সংকট

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ২:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অদ্ভুত এক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও শেয়ারবাজারের সূচক ইতিবাচক হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের মন জয় করতে পারছে না তাঁর প্রশাসন। সংকটটি পরিচিত, কিন্তু এর সমাধান এখনো অনিশ্চিত।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে দ্রুত স্বস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে সঙ্গে সঙ্গেই দাম কমিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, বেকারত্বের হার কম এবং শেয়ারবাজারও প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। তারপরও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবেদন ভোটারদের পরিচিত উদ্বেগই সামনে এনেছে—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো চড়া।

অর্থনীতির সূচক ভালো, স্বস্তি নেই মানুষের

২০২৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। অর্থনৈতিক সূচক শক্তিশালী থাকলেও অনেক ভোটার মনে করেছিলেন, অর্থনীতির সুফল তাঁদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এখন ট্রাম্পের সামনে একই সমস্যার ভিন্ন রূপ দেখা দিয়েছে।

তবে দুই প্রশাসনের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে। বাইডেনকে করোনা মহামারির পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল। অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং নিজস্ব বাণিজ্য ও অভিবাসননীতির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে।

অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় আমেরিকার ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। দেশটির বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ, যা অর্থনীতি ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেয় না। ট্রাম্পের দাবি, বাইডেনের কাছ থেকে তিনি দুর্বল অর্থনীতি পেয়েছিলেন। তাঁর প্রশাসনের নীতি কাজ করছে—এমন প্রমাণ হিসেবে তিনি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।

ট্রাম্পের সহযোগী ও অর্থনৈতিক ভাষ্যকার ল্যারি কুডলো বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ‘কখনো না বলা সেরা গল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর যুক্তি, মানুষের চাকরি যাচ্ছে না।

কিন্তু ভোটারদের কাছে অর্থনীতির চিত্র ভিন্ন। তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সুপারমার্কেটে পণ্যের দাম কত, পেট্রল কিনতে কত খরচ হচ্ছে এবং মাসের বিলগুলো পরিশোধ করা যাচ্ছে কি না।

মজুরি বাড়ছে, কিন্তু দামের সঙ্গে তাল মিলছে না

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের অন্যতম কারণ মজুরি ও মূল্যবৃদ্ধির ব্যবধান। গত এক বছরে গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় বেড়েছে ৩ শতাংশ। বিপরীতে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে আয় বাড়লেও অনেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।

অর্থনীতিবিদ ও ডেমোক্র্যাটদের জরিপকারী সেলিন্ডা লেকের মতে, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ ভোটাররা মুদ্রাস্ফীতিকে ভিন্নভাবে দেখেন। অর্থনীতিবিদরা যখন বলেন মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, তখন তাঁরা সাধারণত মূল্যবৃদ্ধির হার কমার কথা বোঝান। কিন্তু ভোটাররা মনে করেন, দাম কমার অর্থ পণ্যের মূল্য আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া।

লেক বলেন, ভোটাররা অর্থনীতিকে নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করেন, অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়। মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তর্ক করে তাঁদের ধারণা বদলানো কঠিন।

শুল্ক ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা

বাইডেনের সময়ে মূল্যস্ফীতির জন্য তাঁকে দায়ী করেছিলেন সমালোচকেরা। তবে তাঁর প্রশাসন মহামারি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো নিয়ন্ত্রণের বাইরের কারণগুলোর কথা তুলে ধরতে পেরেছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে মনে করছেন কয়েকজন অর্থনীতিবিদ। তাঁদের মতে, বর্তমান উচ্চমূল্যের পেছনে ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।

রিপাবলিকানদের সমর্থক এবং ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ পিটার মরিসির দাবি, ট্রাম্পের শুল্ক ও যুদ্ধের কারণেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ঘোষিত ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শুল্কের কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।

ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে কিছু শুল্ক স্থগিত করেন এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেন। এ ছাড়া জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বাধার মুখেও পড়েন তাঁর প্রশাসন। এসব পদক্ষেপ না থাকলে শুল্কের প্রভাব আরও বেশি হতে পারত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এরপর ইরানের সঙ্গে সংঘাত তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে পেট্রলের খরচ বেড়ে পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

ভোটারদের স্বস্তি দিতে নতুন উদ্যোগ

হোয়াইট হাউস কর কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রেসক্রিপশনের ওষুধের ব্যয় কমানোর উদ্যোগকে আমেরিকান পরিবারগুলোর জন্য প্রশাসনের কাজের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

ট্রাম্প ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারের ওপর সীমা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার ধারণাও সামনে এসেছে।

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কম বেকারত্বের মতো সূচক ভোটারদের উদ্বেগ দূর করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। বাইডেন তাঁর সময়ে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা ও মানুষের ধারণার মধ্যে ব্যবধান কমাতে পারেননি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের সামনেও একই প্রশ্ন—তিনি কি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ কমাতে পারবেন?

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থনীতির প্রকৃত সূচকের পাশাপাশি মানুষ অর্থনীতিকে কীভাবে অনুভব করছেন, সেটিও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: বিবিসি